সম্পাদকের কলমে

নারায়ণ দেবনাথ- সত্যি বলতে কি একটা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হল। একটা বিশাল বড় অধ্যায়, যেখানে বাবা/ মা, ছেলে/ মেয়ে বা দাদু/দিদা, পিসি, ঠাম্মা সব এক হয়ে গেছিল । চলে গেলেন শরীরের দিক থেকে কিন্তু সারাজীবন রয়ে গেলেন মনে, চোখে আর স্বপ্নে। কার্টুন তাও আবার নিখাদ বাংলা ভাষায়, বাংলা চরিত্র নিয়ে, কিন্তু সেই চরিত্র আবার খুব সাহসী। উনি সাহস দেখিয়েছিলেন বলেই বাংলার ঘরে ঘরে বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা পৌঁছে গেছে। নারায়ণ দেবনাথ -এর প্রতি #গল্পগুচ্ছ এর পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ প্রণাম । ভাল থাকবেন, যেখনেই থাকবেন। আমরা কিন্তু আপনার দেশেই রয়ে গেলাম । নমস্কার সহ অঙ্কুর রায় সংখ্যার সম্পাদক অভিজিৎ চক্রবর্ত্তী প্রধান সম্পাদক

লেখা পাঠানোর জন্য

আপনার লেখা পাঠান আমাদেরকে
golpoguccha2018@gmail.com

Total Pageviews

By Boca Nakstrya and Gologuccha . Powered by Blogger.

 উন্নয়নপুর

জয়ন্ত হালদার

রাজ্যের নাম উন্নয়ন পূর। চারিদিকে শুধু উন্নয়ন আর উন্নয়ন ।যেদিকে তাকাও উন্নয়নের আলো চোখ ধাঁধিয়ে যাবে.        মন্ত্রী বলেন ,সেনাপতি বলেন ,এমনকি রাজার বিশ্বস্ত সব কর্মচারী বলেন মহারাজ উন্নয়ন পুর একেবারে উন্নয়নের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে ।কর্মচারিদের কথায় রাজ্ বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয় ।

তার নুন খেয়ে তারা তো আর মিথ্যে বলবেন না ।প্রজাবৎসল রাজার একমাত্র ইচ্ছা উন্নয়ন কি তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে  দেখিয়ে দেবেন ।তিনি তার বাবার আমলের সব বিশ্বস্ত কর্মচারীদের ছাড়িয়ে দিয়ে একদল শিক্ষিত নব্য তরুণদের নিয়োগ করলেন। কারণ মহারাজ বটুক চন্দ্রের আমলের কর্মচারীরা যথার্থ উন্নয়ন কি সেটা কি হৃদয়ঙ্গম করতে পারেনি ।মহারাজ বটুকচন্দ্র তার একমাত্র পুত্র যুবরাজ ফটিক চন্দ্রকে রাজ্যের সেরা পণ্ডিতের কাছে উচ্চশিক্ষিত করেছেন। যথাসময়ে রাজ মুকুট পরিয়ে যুবরাজকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করে নিজে অব্যাহতি নিলেন ।সিংহাসনে বসে তার মাথায় উন্নয়নের ভুত চাপলো । তার শ্বয়নে স্বপনে জাগরণে একটাই চিন্তা কিভাবে রাজ্যকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাওয়া যায়। তিনি তার মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ে বসলেন আলোচনায়। বিষয় কিভাবে রাজ্যকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসান যায় ।,নগর অধ্যক্ষ মহাশয় বললেন ,মহারাজ রাস্তাঘাট সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ এর মাধ্যমে আমরা কৃষ্ণপুর রাজ্যকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যেতে পারি ।মন্ত্রী বললেন উত্তম প্রস্তাব ।শিক্ষাসচিব বলেন মহারাজ কৃষ্ণপুর শব্দটি কি রকম ঠেকছে। পণ্ডিতমশাই অভিধান খুলে বললেন মহারাজ কৃষ্ণ শব্দের অর্থ হলো কালো ।আর কালো মানে অন্ধকার। সঙ্গে সঙ্গে কোটাল বলে উঠলেন মহারাজ যে রাজ্যের নাম অন্ধকার সে রাজ্যে উন্নয়নের আলো কিভাবে ঢুকবে ।সঠিক কথা।  সুতরাং নাম পরিবর্তন অবশ্য প্রয়োজন। শেষে অনেক ভেবেচিন্তে রাজ্যের নাম রাখা হলো উন্নয়ন পুর । রাজামশাই খুশি হয়ে বললেন বাঃএটি রাজ্যের উন্নয়নের প্রথম পদক্ষেপ। তিনি খুশি হয়ে সভাপণ্ডিতকে নিজের গলার স্বর্ণহার দান করলেন।.                            

রাজ্যে অঘোষিত জরুরি অবস্থা। রাজা তার সমস্ত কর্মচারীদের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে রাজ্যের কোথায় কি অসুবিধা প্রজাদের কি সমস্যা সব তালিকা তৈরি করতে বললেন। সাত দিনের মধ্যে তালিকা প্রস্তুত ।তৈরি হলো বিশেষজ্ঞ কমিটি ।মহারাজ বললেন রাজ্য এমন ভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, নতুন প্রকল্প তৈরি করতে হবে যাতে অন্যান্য রাজ্যের কাছে উন্নয়নপুর একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে।  প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা বরাদ্দ হল । কর্মচারীদের তৎপরতা দেখে তিনি যারপরনাই খুশি হলেন ।একমাত্র মন্ত্রী বুড়ো ছাড়া আর সকলেই যথার্থ উন্নয়ন কি উপলব্ধি করতে লাগলেন। সবারই বেতন বৃদ্ধি হলো। কেবলমাত্র তিনি  উন্নয়নের গুঁতোয় হাঁসফাঁস করতে লাগলেন।.   

                               একদিন রাজসভায় রাজামশাই যখন নগর উন্নয়ন মন্ত্রীর সঙ্গে রাজ্যের অর্থসংকটের কথা আলোচনা করছিলেন সেই সময় মন্ত্রী বুড়ো কথাটা পাড়লেন। মহারাজ অনেক তো বয়স হয়েছে এবারে আমাকে অব্যাহতি দিন।এ কথা শুনে রাজা মশাই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন একি মন্ত্রী মশাই হঠাৎ আপনার কি হলো আপনি মন্ত্রীত্ব ছাড়তে চাইছেন কেন। মহারাজ এমনিতে আমার বয়স হয়েছে আগের মত আমার কর্মদক্ষতা নেই আর যে গতিতে উন্নয়ন পুরের উন্নয়ন হচ্ছে তার সাথে পাল্লা দেওয়ার আমার পক্ষে সম্ভব নয। রাজা মশাই মহা চিন্তায় পড়লেন। তার এমন মন্ত্রী চলে গেলে রাজ্যের উন্নয়ন কিভাবে এগোবে। তিনি ভাবতে লাগলেন। কোন সমাধান বেরোলো না। অবশেষে তিনি মন্ত্রী কে বললেন ঠিক আছে আপনাকে ছাড়তে পারি তবে একটা শর্তে আপনার জায়গায় আমি একজন যোগ্য  লোককে মন্ত্রী হিসেবে পেলেই তবে আপনাকে ছাড়বো। বুড়োমন্ত্রী মহা ফাঁপরে পড়লেন। কাকে কিসের ভিত্তিতে মন্ত্রী হিসেবে তিনি বাছবেন।  অনেক ভেবে বললেন মহারাজ দুদিন সময় দিন কিভাবে যোগ্য মন্ত্রী আপনি পাবেন তার একটা উপায় বাতলে দেবো ।

       এদিকে রাজামশাই নিজের চোখে উন্নয়ন দেখতে বেরিয়ে পড়লেন ।রাজ্য ভ্রমনে  উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে ঘুরে তিনি বিস্মৃত। নগর উন্নয়নমন্ত্রীকে বললেন সত্যিই আপনাকে প্রশংসা না করে পারছি না। রাজা এবারে রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত যাবেন। বেশিরভাগ উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল পার্বত্য এলাকা। কিন্তু নগর উন্নয়নমন্ত্রী বললেন মহারাজ এখন দুপুর বারোটা আপনার মধ্যাহ্ন  ভোজনের সময়  অতিক্রান্ত। আপনি  ক্লান্ত রাজপ্রাসাদে ফিরে চলুন অন্য কোন একদিন আমরা ওই অঞ্চলে পরিদর্শনে যাব। রাজামশাই প্রাসাদে ফিরে দেখেন মন্ত্রীমশাই বসে আছেন তার অপেক্ষায়। কুশল বিনিময়ের পর মহারাজ বললেন আজ স্বচক্ষে দেখলাম উন্নয়ন কাকে বলে। মন্ত্রী মশাই বললেন মহারাজ রাজ্যের পূর্ব পশ্চিম প্রান্তে গিয়েছিলেন কি। গেলে ভাল করতেন। দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর রাজামশাই বুড়ো মন্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন। বলুন আপনি কি ভেবেছেন।                                           

        মহারাজ একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করুন।কিন্তু প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা সঙ্গে মন্ত্রী নির্বাচনের কি সম্পর্ক আছে।৷             

আপনি বলেছিলেন না একজন যোগ্য মন্ত্রী নির্বাচন করতে। আপনার সেই নির্দেশ মত আমি কাজ করছি। আপনি আমার উপর ভরসা করতে পারেন। রাজা আর কথা বাড়ালেন না। মন্ত্রীর কথা মতো রাজামশাই সারা রাজ্যে ঢেঁড়া পিটিয়ে দিলেন শুনুন, শুনুন, শুনুন উন্নয়নপুরের সমস্ত প্রজারা শুনুন। মহারাজ ফটিক চন্দ্র এক বিরাট প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন আট থেকে আশি যে কোন বয়সের যে কোন ব্যক্তি অনধিক সাতশ শব্দের মধ্যে একটি প্রবন্ধ রচনা করবেন। প্রবন্ধের বিষয় "উন্নয়ন এর আরেক নাম মহারাজ ফটিক চন্দ্র। " রাজ বিচারে সেরা প্রবন্ধ লেখক কে উপযুক্ত পুরস্কারে ভূষিত করা হবে এবং তিনি হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। সময় দেয়া হল দশদিন ঠিক হল দশদিন পরে প্রতিদিন দশজন প্রবন্ধ লেখক কে ডেকে নেয়া হবে এবং দরবারে   রাজসমক্ষে প্রতিদিন দশটি প্রবন্ধ পাঠ করা হবে। রাজা ফটিক চন্দ্রের উন্নয়নের জোয়ারে রাজ্যে বুদ্ধিজীবী শিক্ষিত সম্প্রদায়ের লোকের অভাব নেই। রাজামশাই আনন্দিত হলেন এই ভেবে যে এদের লেখায় উন্নয়ন প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠবে। দশ দিন পরে এলেন প্রথম প্রবন্ধ নিয়ে পন্ডিত  হল ধর আচার্য।আচার্য্য মশাই শুরু করলেন বিশুদ্ধ উচ্চারণের সুস্পষ্ট ভাষায়, মহারাজ ফটিকচন্দ্র ও উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক।

মহারাজ ব্যতিরেকে উন্নয়ন.....অসম্ভব........................ইত্যাদি ইত্যাদি।  তার উন্নয়নের প্রভাবে দারিদ্র কি? অনাহার কি? প্রজা পীড়ন কি? এই শব্দগুলি এখন অপ্রচলিত। পৃথিবীতে যদি স্বর্গ বলে কিছু থাকে তাহলে সেটা উন্নয়নপুর।   কোটিপতি থেকে একেবারে ক্ষেত্র মজুরের ঘরে সর্বত্রই উন্নয়নের অবাধ গতি। রাজা মুগ্ধ। মন্ত্রী নির্বাক। রাজা মনে মনে বললেন এই আচার্য ই তার মন্ত্রী হবার উপযুক্ত। বুড়ো মন্ত্রী রাজ মনোভাব বুঝতে পেরে বললেন মহারাজ অত চিন্তা কি আগে দশ দিনে সব প্রবন্ধ পাঠ হয়ে যাক তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। এমনি করে দশ দিনে রাজ্যে শিক্ষা সচিব কর্মসচিব অভিজাত ও বুদ্ধিজীবীরা একে একে প্রতিদিন দশটি করে প্রবন্ধ পাঠ করে গেলেন। সবই  পন্ডিতের মতো। কেবল শেষ দিনে নবম প্রবন্ধ পাঠ এরপর আরেকটি প্রবন্ধ পড়তে বাকি আছে। প্রবন্ধ লেখক প্রবন্ধ পাঠ না করে চলে যাচ্ছে দেখে মন্ত্রী মশাই ডাকলেন। এদিকে এসো তোমার নাম কি।
ভদ্র সেন।              
তুমি প্রবন্ধ পাঠ না করে চলে যাচ্ছো কেন?   
শীলভদ্র খুবই বিনয়ের সঙ্গে এবং দুরু দুরু বক্ষে বলল,মহারাজ আমার প্রবন্ধ আপনার ভালো লাগবে না আমি রাজরোষে পড়ে যেতে পারি। তাই চলে যাচ্ছি। যদি অভয় দেন তো পাঠ করি।                               
মন্ত্রী আশ্বস্ত করলেন। মহারাজ অভয় দিলেন।, শীলভদ্র শুরু করলো, শরীরের কোন একটি অঙ্গ বিকল হলে যেমন ওই ব্যক্তিকে সুস্থ বলা যায় না তেমনি বিক্ষিপ্তভাবে দু একটি অঞ্চলের উন্নতি, কে প্রজা মঙ্গলকে উন্নয়ন বলা যায়না। মহারাজ রাজ্যের পূর্ব প্রান্তে কখনো যাননি গেলে বুঝতে পারতেন উন্নয়নে সঠিক মানে। সেখানে প্রজারা কি পরিমাণে অবহেলিত কিরূপে তারা দিন যাপন করে সে সম্পর্কে মহারাজ অবগত নন। মহারাজের অর্থ যথার্থই পূজা কল্যানে  ব্যায়িত হচ্ছে কিনা সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত নন। ইত্যাদি ইত্যাদি।.....

সামগ্রিক পর্যালোচনা করে আমি একজন নগরবাসী হিসেবে এই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে উন্নয়নের আরেক নাম মহারাজ ফটিক চন্দ্র এই মত গ্রহণযোগ্য নয়। মহারাজের চোখ ক্রোধে রক্তবর্ণ হয়ে গেল। শীলভদ্র ভয়ে কাঁপতে লাগলো। মন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করলেন। মহারাজ কে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে তিনি শীলভদ্র কে অভয় দিয়েছিলেন। মহারাজ নিজেকে খানিকটা নিয়ন্ত্রণ করে বললেন মন্ত্রী মশাই একে দূর করে দিন।
        মন্ত্রী মশাই হেসে ফেললেন। রাজা বিস্মিত। আপনি হাসছেন। হ্যাঁ মহারাজ এই শীলভদ্র মন্ত্রী হবার উপযুক্ত৷        
মহারাজের বিস্ময় আরো বেড়ে গেল। বললেন আপনি কি বলছেন,এভাবে একজন রাজ নিন্দা কারি ব্যক্তিকে আমার মন্ত্রী করব? মন্ত্রী ঈষৎ হাসলেন বললেন আগের যে প্রবন্ধ লেখকগণ সব আপনার চাটুকার পদলেহী মিথ্যে প্রশংসায় আপনাকে ভরিয়ে দিয়েছে। শীলভদ্র একমাত্র ব্যক্তি যে রাজরোষ উপেক্ষা করে নির্ভীকভাবে অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করেছে।
    আর মহারাজ অপ্রিয় সত্য সব সময় কটু হয়। ওর কোন মন্ত্রীত্বের লোভ নেই।
মন্ত্রীর কথা রাজার ঘুম ভাঙলো। সানন্দে আসন থেকে নেমে এলেন মন্ত্রী।তার আগে শপথ বাক্য পাঠ। আমি শ্রী শীলভদ্র সেন শপথ করছি যে  উন্নয়ন পুরের সার্বিক প্রজা কল্যান ও
উন্নয়ন করাই আজ থেকে আমার ধ্যান জ্ঞান।

0 comments: