সম্পাদকের কলমে
লেখা পাঠানোর জন্য
Total Pageviews
বৈচিত্রময় এই ভারত
তপন কুমার দাস
শত সহস্র বছরের বৈচিত্র্যময় এই ভারত। কবির ভাষায় শক হুন দল মোঘল পাঠান, এক দেহে হলো লীন। কিন্তু সত্যিই কি একই বৃন্তে দুটি কুসুম হয়ে থাকতি পারছি আমরা ? পারতাম, কিন্তু মাঝে প্রাচীর হয়ে দাড়িয়েছে ধর্মগুরুর স্বার্থ দন্দ্বে প্রভাবিত ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠী। উদারনীতির নামে বিশ্বায়ন মানে বিশ্ব ব্যাবসার পথ দেশে দেশে সাধারন মানুষের দুর্দশা লাঘব নয়, আদতে বাড়িয়েছে। মানুষের অসন্তোষের মেঘ ক্রমশ ঘনীভুত হচ্ছে। এই অবস্থায় ভাগ করো শাসন করো নীতিতেই চলছে দেশে দেশে বুর্জোয়া শাসক গোষ্ঠী। এ ভারত ও তার বাইরে নয়। ধর্ম জাত পাতে র বিভাজন কে উস্কে দেওয়া হচ্ছে। এই বিবাদের মধ্যেই সমাধানের পথ খুঁজে নিতে উৎসাহিত করছে এদেশের শাসক গোষ্ঠীও। বাড়ছে রাজনীতি আর সমাজজীবনে এই বিভাজনের খেলা। রাষ্ট্রশক্তি প্রচার মাধ্যমে কে ব্যবহার করে, বিষ পৌছে দিচ্ছে ছেলে বুড়ো সবার অন্তরে। এমনকি পাঠ্য পুস্তক, সিলেবাসের সিড়ি বেয়ে ঘৃণার বার্তা পৌছে দেওয়া হচ্ছে শিশুমনেও।
এদেশে ইসলামের আগমন সহস্র বছর আগে। বিবাদের পরিবেশ যে কোন অংশে ছিলোনা তা নয়। কিন্তু কখনোই তা নৈতিক আবরণকে ভেঙে দিতে পারেননি। বিবাদের পরিবেশ যখন তীব্র হয়ে উঠেছে,
সমাজের শান্তি আর সুস্থিতি র বার্তা দিতে নানক,
কবীর, রমানন্দ, চৈতন্য,
হাল-ফিলে রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ, আমার কিন্তু মনে হয়,
দীর্ঘ বছর ধরে বহমান শত সহস্র বছরের বৈচিত্র্যময় এই ভারত। কবির ভাষায় শক হুন দল মোঘল পাঠান,
এক দেহে হলো লীন। কিন্তু সত্যিই কি একই বৃন্তে দুটি কুসুম হয়ে থাকতি পারছি আমরা
? পারতাম, কিন্তু মাঝে প্রাচীর হয়ে দাড়িয়েছে ধর্মগুরুর স্বার্থ দন্দ্বে প্রভাবিত ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠী। উদারনীতির নামে বিশ্বায়ন মানে বিশ্ব ব্যাবসার পথ দেশে দেশে সাধারন মানুষের দুর্দশা লাঘব নয়,
আদতে বাড়িয়েছে। মানুষের অসন্তোষের মেঘ ক্রমশ ঘনীভুত হচ্ছে। এই অবস্থায় ভাগ করো শাসন করো নীতিতেই চলছে দেশে দেশে বুর্জোয়া শাসক গোষ্ঠী। এ ভারত ও তার বাইরে নয়। ধর্ম জাত পাতে র বিভাজন কে উস্কে দেওয়া হচ্ছে। এই বিবাদের মধ্যেই সমাধানের পথ খুঁজে নিতে উৎসাহিত করছে এদেশের শাসক গোষ্ঠীও। বাড়ছে রাজনীতি আর সমাজজীবনে এই বিভাজনের খেলা। রাষ্ট্রশক্তি প্রচার মাধ্যমে কে ব্যবহার করে, বিষ পৌছে দিচ্ছে ছেলে বুড়ো সবার অন্তরে। এমনকি পাঠ্য পুস্তক,
সিলেবাসের সিড়ি বেয়ে ঘৃণার বার্তা পৌছে দেওয়া হচ্ছে শিশুমনেও।
এখন প্রশ্ন হলো এই বিষ সমাজ জীবনের গভীরে পৌছাতে পারবে কতটা ? ভারতীয় সমাজকে ছিন্নভিন্ন করতে পারবে কী ? বিভিন্ন ফুলে গাথা মালা খানির গ্রন্থি খানি ছিড়ে পরবে কী ? অবশ্যই এ নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসে গেছে।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাস্তব,
বর্তমান সময়ে সেই সংহতি ভাঙার ক্রমাগত প্রয়াস চলছে। আর তার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের বর্তমান পরিচালক ও সংগঠিত শক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো,দীর্ঘ বছর ধরে বহমান ঐতিহ্য,
পরমত সহিষ্ণুতার ধারাকে বিতর্ক বিবাদের পরিবেশ বিষময় করে তুলতে পারবে কতটা
?
আমাদের অনুভব কিন্তু অন্য কথা বলে। ছোট বেলায় দেখতাম সুরেলা গানের সুরে হাতের চামর খানি দুলিয়ে বাড়ি বাড়ি আসতেন পীর বাবারা। আমার মায়ের মত অনেক মা-ই এগিয়ে দিতেন তার সন্তানদের.
একটু আশীর্বাদের আশায়।
বাড়ির কাছেই রয়েছেন পুরনো কবরস্থান। আসতেন ইসলামের উপাসক-রা,
সন্ধ্যায় আলো জ্বালিয়ে নমস্কার করে যেতেন তাদের আরাধ্য দেবতাকে। চলতে চলতে প্রায়শই নজরে আসতো,
হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে,
কায় মনো বাক্যে
ঐ একই দেবতাকে প্রনাম জানিয়ে প্রার্থনা করছেন কোন হিন্দু রমনী। কখনো তাদের মনে হয়নি যে বিধর্মী দেবতাকে নৈবেদ্য তুলে দিচ্ছেন তারা । আসলে সহস্র বছরের পাশাপাশি অবস্থান শুধু একের প্রতিও আস্থা বৃদ্ধি শুধু নয় অন্য ধর্মের প্রতি সমান বিশ্বাস আর ভরসার জায়গা তৈরী খানি করে দিয়েছে।
সেবার চলেছিলাম অমরনাথের পথে। মুসলিম ঘোড়াওয়ালার দাড়িয়ে থাকা ঘোড়ায় চেপে ঈশ্বরের দরজায় পাড়ি দিয়ে চলেছে অশক্ত হিন্দু প্রবীণ প্রবীণা। পঞ্চ-তরণী পাড় হয়ে,
পাহাড়ের কোল বেয়ে অবশেষে মোড় নিলাম ডান-মুখী। দুরে দাড়িয়ে অমরনাথ। পায়ের তলায় বরফ,
এক জায়গায় বেশিক্ষণ দাড়িয়ে থাকা দায়। তারই মাঝে হাসিমুখে সারি সারি দাড়িয়ে,
দাড়ি-মুখ
মুসলিম ফুল বিক্রেতা। হাতে হাতে এগিয়ে দিয়ে চলেছে ফুলের ডালি। যে ফুল বিনে পূজো অসম্পূর্ণ হিন্দু পুরোহিত কিম্বা দর্শনার্থীদের। এ বন্ধন ছিন্ন করিবে কে
?
গঙ্গার দূষণ নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর বক্তব্যের ডালি নিয়ে গোমুখ থেকে হরিদ্বার হয়ে আমাদের পয়তাল্লিশ দিনের সাইকেল রালি এগিয়ে চলেছে কানপুরের অভিমুখে। শা সওয়ান ছেড়ে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় মুখে। পিছনে গাড়ির ডাক শুনে থমকে দাড়া লাম। গাড়ি থেকে নেমে এলো ফেলে আসা শহরের মেয়র। বললেন, চলুন,আমাদের সাথে, রাতে আমাদের আশ্রয়ে। আবার পিছু যাবো, মন সায় দিলো না। এগিয়ে চললাম সামনের শহরে। মুসলিম অধ্যুষিত শহর। ঘিঞ্জি বসতি, কিন্তু অভ্যর্থনায় খামতি নেই। বললেন, গঙ্গা আমাদের সবার। আমাদের চাষবাস জীবিকা সবই গঙ্গা নির্ভর। আমাদের বাচিয়ে রেখেছে।
এরই মাঝে, আবার হাজির আর এস এস এর দলবল। আমাদের নিয়ে যেতে চায় তারা ফেলে আসা পৌরসভার অতিথি শালায়। আবার অন্যদিকে আমাদের সেই রাতের আশ্রয় দাতা ও স্থানীয় কিছু মানুষ। আমাদের আতিথেয়তা কারা করবে তা নিয়ে দুই পক্ষ প্রায় তাই সমুখ সমরে। উদ্বিগ্ন আমরা,
এই রে, আমাদের নিয়ে শেষে দাঙ্গা বাধবে নাকি
! না শেষে বুঝিয়ে দুপক্ষ নিরস্ত করা গেলো। বুঝলাম,
হিন্দু অভিযাত্রীদের প্রতি মুসলিম জনতার কোন
ক্ষোভ নেই, ক্ষোভ বরং তাদের প্রতি,
যারা ধর্মের
নামে বিবাদের পরিবেশ তৈরি করে চলেছে
গঙ্গার প্রতি তাদেরও সমান ভালোবাসা রয়েছে। গঙ্গা যখন কোন ভাগাভাগি করেনি, মিছেই কেনো আমরা ভাগাভাগি আর লাঠালাঠি করে মরি।
বৌদ্ধ মন্দির,শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কা অভিযানে আমার বেশিরভাগ রাত কেটেছে বৌদ্ধ মন্দির গুলোতে। কলম্বো বৌদ্ধ মন্দিরে দ্বিধা নিয়ে হাজির হয়েছিলাম। ভীন দেশী, ভীন ধর্মী,
থাকতে দেবে কিনা বুঝতে পারছিলাম না। এদেশে বৌদ্ধ ধর্ম তেমন বড় অনুগামী না পাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করলেন ট্রাষ্টি সদস্য। জবাবে বলেছিলাম,
দুঃখ করবেননা। বুদ্ধকে সম্মান করেননা,
ভালোবাসেন না, এমন ভারতীয় বিরল। তবে হ্যাঁ,
শেষ পর্যন্ত
সব সংশয় দুর করে
, তারা থাকতে দিলেন শুধু তাই নয়,
তাদের দেওয়া চিঠি দেখিয়েই আমি শ্রীলঙ্কার সর্বত্র বাকি মন্দির গুলোতে থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। রাতের খাবার শুধু নয়,
সকালে বেরোনোর সময় যতটা সম্ভব পথের খাবার ভরে দিতেন ব্যাগে।
শ্রীলঙ্কা
দেশে কিম্বা বিদেশে,
সম্পর্ক বা মানুষে মানুষে সম্প্রীতির চেহারা একই। দেশ কাল স্থান ভেদে বড় হয়ে ওঠে মানুষের পরিচয়। চাই দূষণ মুক্ত পৃথিবী,শান্তি ও সম্প্রীতির পৃথিবী
- এই-আবেদনে ছুটে চলেছে কাম্বোডিয়ায় আমাদের সাইকেল।
কাম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের পথে এগিয়ে চলেছি। রাত আটটা,
পথ চলতি দোকান সব বন্ধ হতে যায়। অন্ধকার হাইওয়ে বেশি দুর এগনো ঠিক হবেনা। সামনে দোকানদার কে জিজ্ঞেস করতে জানান দিলো
, হোটেল আছে, কিন্তু পচিশ কিমি দুরে। ওরে বাবা সে তো অনেক দুর,
কাছাকাছি কিছু নেই। একটু ভেবে দোকান দারের উত্তর,না,
তবে মসজিদ একটি রয়েছে,
আপত্তি না থাকলে থাকতে পারেন। একঝলক ফিরে তাকালাম,
আমার ধর্মপ্রাণ
বন্ধুর দিকে। তার সোজা জবাব,
স্যার, আমাদের গুরু বলেন,
ধর্ম নয়, মানুষই সব। ভালো লাগলো,
ধর্ম যদি এমন মানবিক হয়,
তাহলেই তো সমস্যা থাকেনা। মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই দোকানদার তার দোকানে আসা কম বয়সী দুই ছেলেকে ডেকে বললেন,
নিয়ে যা ওনাদের তোদের মাদ্রাসায়। আজ রাতে ওনারা তোদের সাথেই থাক।
কাম্বোডিয়ার মসজিদে।
এতক্ষণ ওদের কৌতুহলী চোখ আমাদের নারী নক্ষত্র খুঁজে বেড়াচ্ছিল। মুখ থেকে কথা না খসতেই,
হৈ হৈ করে আমাদের ব্যাগ সাইকেল সব নিয়ে এগোতে থাকলো মাদ্রাসার দিকে। ভেতরে বড় হলঘর গোটা দুয়েক। এক ভাগে ওদের শোবার গোটা কয়েক মাদুর পাতা। তারই পাশে ঝাঁড় দিয়ে আরো গোটা দুই মাদুর পেতে তারা বললে,
"নাও,শুয়ে পড়ো।"
বললাম সে কিরে, স্নান খাওয়া সারবো-না
? স্নান সেরে, চিরঞ্জিত কে খাবার আনতে পাঠাবো,
হটাৎ আরেক ছাত্র এসে হাজির। গাট্টা গোট্টা চেহারা,
কিন্তু কথা কইতে পারেনা। ইশারায় কি বলতেই বাকি ছেলের দশ নড়ে চড়ে উঠলো। চলো চলো করে আমাদের ব্যাগপত্র নিয়ে এগোতে থাকলো। আরে চললি কোথায়
? উত্তর এলো, গুরু মশাই এর আদেশ হয়েছে। তোমরা অতিথি,তোমাদের মসজিদে থাকতে হবে। বললাম বেশতো ছিলাম,
আবার ওখানে কেনো
? কিন্তু গুরু মশাই এর আদেশ বলে কথা,
আমার কথা শুনবে কেনো ?
বেশ বড় মসজিদ, কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকার। কারেন্ট বাচাতে হবে। তাই পাখা যদিও বা চললো,
কিন্তু নো লাইট। অন্ধকারে বালিস মাদুর পেতে দিতে বসলাম তাতে,কিন্তু খালি পেটেতো ঘুম আসবেনা,
তাই, চিরঞ্জিত ওদের নিয়ে চললো খাবারের দোকানে। সামনে প্রায় অন্ধকারে বসে একে অপরের দিকে তাকিয়ে,
আমি আর নবাগত সেই মুক বধির বালক। কেনো জানিনা,
মাঝে মধ্যেই ও আমার হাতটি টেনে ধরার চেষ্টা করছে। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মনের ভাষা বোঝবার চেষ্টা করছি। হটাৎই আচমকা ও যেনো ঝাপিয়ে পড়লো আমার ওপর,
হাত খানা জোড়ে চেপে ধরলো। ঘাবড়ে গিয়ে এই কি করছিস বলে চেচিয়ে উঠলাম আমি।
পরক্ষনেই আমার ভুল ভেঙে গেলো,
চোখ ফেটে যেন জল বেড়িয়ে এলো। বুঝলাম,
অনেক পথ পেড়িয়ে এসেছি,
গুরু মশাই এর আদেশ,
তাই ও আমার হাত পা গুলো টিপে দিতে চায়। আচমকা মুখ থেকে বেড়িয়ে এলো,
হা ! ঈশ্বর। তোরা তো দেবদুতরে
! তোদেরকেই আমি চোর ডাকাত বলে ভাবছিলাম। নিজেকেই ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হলো। বুঝলাম এরকম ভুল ভাবনা,
ভুল বোঝাবুঝিই, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দুই সম্প্রদায়ের মাঝে প্রাচীর হয়ে দাড়িয়ে আছে। যে কোন মূল্যে এই প্রাচীর ভাঙতেই হবে আমাদের।
সুলতান মসজিদ,মালয়েশিয়া
চলেছি মালয়েশিয়ার মালাক্কা বন্দর ছাড়িয়ে সিঙ্গাপুরের পথে। সন্ধা পেরিয়ে পৌছালাম মাঝারি মাপের এক শহরে। কোথায় থাকা যায়
? মসজিদ আছে কী ? বলা বাহুল্য ততদিনে মসজিদে রাত কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। প্রবাসী বাংলাদেশী যুবক জবাব দিলো,
হ্যাঁ, চলে যান,
ঐ সামনে সুলতান মসজিদ।বিরাট চৌহদ্দি নিয়ে গড়ে ওঠা চোখ ধাঁধাঁনো,
মালয়েশিয়ার সব চেয়ে বড় মসজিদ। নামাজ শেষ,
লোকজন বেরিয়ে যাচ্ছে,
কেউবা বাইকে, কেউবা চার চাকায়। ফাঁকা হতে ঢুকে পরলাম ভেতরে। গোলকধাঁধা পেড়িয়ে ভেতরে হলে পৌছে মৌলবী সাহেব কে নিজের পরিচয় দিয়ে প্রশ্ন করলাম,
রাতটা কাটাবো এখানে। উত্তরে ভদ্রলোক পরম স্নেহে জবাব দিলেন,
কেনো নয়
? কিন্তু এমন দিনে আইলেন,
আমাদের এখন উপোস চলছে,
কি খেতে দিই আপনাকে
? কিছুক্ষণ পরে এক রেকাবিতে সুজির বরফি,
গোটা কয়েক মিষ্টি,
কাটা ফল দিয়ে বললেন খান খেয়ে নিন। গোটা দুয়েক বাচ্চার সাথে কথা বলতে বলতে গলাধ করণ করতে করতে তখন ভাবছি, কেনো এই মাঝখানের তৈরী করা অদৃশ্য বেড়া। মানব সত্তায় কোন ফাঁরাক আছে কী
?
ঈদের আগের এক রাত। পৌছালাম ইন্দোনেশিয়ার এক অনামী শহরের মসজিদে। কিশোরীর দল পরম স্নেহে ঝাড়পোছ করে চলেছে। কাল যে ওদের খুশির ঈদ। ওদের সাথে ছবি তুলে,নামাজ শেষ হবার অপেক্ষায় সামনের এক চায়ের দোকানে ঠাই নিলাম। গল্প করতে করতে রাত নটা। হটাৎ তাকিয়ে দেখি সেই মেয়ের দল এসে হাজির,
বড় এক পোটলা হাতে,
ভালোবাসার সুর মিশিয়ে বললো নাও। খুলে হাসি পেলো চালচুলো হীন মানুষটাকে রান্না করে খাবার জন্য তারা দিয়েছে,
চাল, আলু, ফল আর ওদের কুড়ি-হাজার টাকা। হাসি পেলেও ভালো লাগলো অনা-হুতো এই অতিথিকে তারা এই ব্যস্ততার মাঝেও ভোলেনি।
ইন্দোনেশিয়া মসজিদে ছাত্রীরা
ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব জাভার সিমে-রাঙ প্রদেশ। সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাত হয়েছে কিছুটা। স্টেট হাইওয়ে,
অন্ধকার পথ, দুরপাল্লার বাসগুলো ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলে যায়। খিদে পেয়েছে অনেক আগেই,
কিন্তু পকেটে ফাঁকা। শহর এলে এ.টি.
এমে টাকা তুলে তবে খাবার জুটবে। শহর তখনো চার কিমি দুরে,
হটাৎ ই বা-হাতি মসজিদ দেখে দাড়িয়ে পরলাম। মসজিদের সামনে সারি সারি বাইক। ঈদের ছুটিতে বাড়িমুখো সবাই। মাঝে রাত-খানি কাটিয়ে যায় অনেকেই মসজিদে। সাইকেল খানি দাড় করিয়ে,
ভেতরে হাতমুখ ধুয়ে রুমালে মুখ মুছতে মুছতে এপাশ ওপাশ করছি। পাশে বাড়ির মাঝেই এক দোকান। চা জলখাবার সবই রয়েছে। হটাৎ মনে পড়লো পকেটে তো টাকা নেই। ঘুরে চলে আসছিলাম, পেছন থেকে দোকানী মহিলার সুরেলা ডাক। কিছু খাবেন
? বললাম, ইচ্ছে তো ছিল,
কিন্তু পয়সা নেই যে। দোকানী চায়ের গ্লাস খানি ধরিয়ে বললো,
নিন,পয়সা লাগবেনা। গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে স্থানীয় যুবকের সাথে আলোচনা জুড়লাম। বীমা অফিসার,
কর্ম-সুত্রে ইংরেজি জানে। সুবিধাই হলো,
দেশ কাল রাজনীতি, সেদেশের অর্থনীতি কোন কিছুই আলোচনা বাদ গেলো-না। রাত নটা,
আর দেরি করা ঠিক হবেনা। চলে আসবো,
এমন সময় আবার ডাক,
হাতে রকমারি পদে সাজানো ভাতের থালা এগিয়ে দিলো দোকানী। সসংকোচে বলে উঠলাম,
আরে বললাম যে,
আমার কাছে পয়সা নেই। জবাব দিলো যুবকের দল,
আপনি খেয়ে নিন,
পয়সা আমরাই দেবো। আপনি আমাদের অতিথি। ভালোবাসার এই রঙকে ঘৃণার কোনো জালেই বোধহয় আটকে রাখা যায়না।
ইন্দোনেশিয়ায় স্থানীয় যুবকদের সাথে
দক্ষিণ কোরিয়া পরিক্রমা করে রাজধানী সিও লে ফিরে আসছি। আজই রাতে ধরতে হবে দেশে ফেরার ফ্লাইট। দুপুর একটা।পাহাড়ি পথ এখনো ষাট কিমি বাকি। পাচটার আগে পৌছে সাইকেল দোকানে সাইকেল প্যাক করা চাই। দোকান সব পাচ-টায় বন্ধ হয়ে যায়। কিভাবে পৌছাব।বুঝে উঠতে পারছিনা। সাই সাই করে ছুটছি সাইকেল পথে সুরঙ্গের পর সুরঙ্গ পেরিয়ে। বিকেল চারটে,
দুরে দেখা যাচ্ছে সিওল টাওয়ার। পাহাড়ি পথ ছেড়ে,
নদীকে পাশে রেখে,
হু হু করে নিচে নেমে আসছি। এক কোরিও স্বামী স্ত্রী,
এক বড় সাইকেলে, দুই প্যাডেলে চাপ দিয়ে একসাথে চালিয়ে আসছে। তাদের পাশ কাটিয়ে কিছুটা এগোতে,
হটাৎ পেছনের ক্যারিয়ার খানি ঝুলে পড়লো। এই যাঃ। দশ কিমি পথ এখনো বাকি,
সাইকেল টানলেও এগোয়-না,
কি করি ! হটাৎ পাশে তাকাতে দেখি,
সাইকেল থেকে নেমে এসেছে স্বামী স্ত্রী। নিজের ব্যাগ থেকে যন্ত্রপাতি বার করে কিছু সময়ে সাইকেল ঠিক করে দিলেন ভদ্রলোক। মহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম,
খাবার জল আছে, মহিলা অপ্রস্তুত মুখে বললেন না,
নেই। সাইকেল আবার চলতে শুরু করলো। কিমি দুয়েক এগিয়ে দেখি,
স্বামী স্ত্রী দাড়িয়ে রয়েছেন দু'লিটারের এক জলের আর কোল্ড ড্রিঙ্ক-সের বোতল হাতে। কোল্ড ড্রিঙ্কস চুমুক দেবার ফাকে ভদ্রলোক আবার যন্ত্রপাতি নিয়ে আমার সাইকেল সাড়া তে নেমে পরছিলেন। আমি থামিয়ে বললাম,
সাইকেল শহরে পৌছেই খুলতে হবে আমাকে। এখন আর বাকিটা ঠিক করার দরকার নেই,
আপনি বরং শহরে একটি সাইকেল দোকানে পৌছে দিন। বলা বাহুল্য ওনার বদান্যতাতেই পোনে পাচ-টায় সিওল শহরে এক সাইকেল দোকানে পৌছালাম। শুধু তাই নয়,
দোকানদার প্যাকিং করতে কুড়ি ডলার চাওয়ায় তিনি দোকানদারের গজগজানি উপেক্ষা করে,নিজেই যন্ত্রপাতি দিয়ে সাইকেল খানি খুলে প্যাকিং ও করে দিলেন।
এয়ারপোর্ট পাড়ি দিতে হবে দেশে ফেরার লক্ষ্যে,
কিন্তু সেও এক জ্বালা। দুরত্ব বুঝে ট্যাক্সিও অনেকগুলো টাকা চেয়ে বসলো। বাসে গেলেই ভালো,
কিন্তু সে বাসস্ট্যান্ড ও দু কিমি দুরে,
চিনিও-না । এই বিরাট বক্স নিয়ে যাবো,সেই গাড়িও হাতের সামনে নেই। দু'একমিনিট কি করবো ভাবছিলাম,
তার ফাঁকেই অবাক হয়ে দেখি স্বামী স্ত্রী তাদের বড় সাইকেল টার ঘাড়ে আমার সাইকেলের বক্স খানি চাপিয়ে দিয়েছেন। ভদ্রলোক সাইকেল টেনে নিয়ে চলেছেন,
তার স্ত্রী পেছনে ঠেলছেন,
আমি যেন সেখানে অতিথি মাত্র। অপরের জন্য প্রান-পাতের এমন দৃশ্য আমি জীবনে ভুলবো না। দুকিমি জ্যামজটের ভীড় পেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে যখন পৌছালাম,
তখন সন্ধ্যা ছটা। পৌছেও তারা আমায় ছেড়ে যেতে নারাজ। আধাঘণ্টা দাড়িয়ে,
বাস এলে সাইকেল খানি বাসে তুলে দিয়ে,
ড্রাইভার কে ঠিক ঠাক নামিয়ে দেবার জন্য বলে দিলেন। বাস ছাড়বে,
ধন্যবাদ, আর অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে হাতখানি বাড়িয়ে দিলাম বললাম,
আপনারা যা করলেন, তার তুলনা নেই,
হয়তো আমি ফ্লাইট টাই মিস করতাম।
|
1সি ওলে |
ভদ্রলোক বলে উঠলেন,
শুনুন, আমি ধর্মপ্রাণ খৃষ্টান। আমার ধর্ম বলে,
সমস্যা ক্লিষ্ট মানুষের পাশে দাঁড়াও। হোকনা আপনার ধর্ম কিম্বা দেশ আলাদা,
আপনি মানুষ, মানুষ হিসেবে আপনার পাশে দাড়িয়ে আমার সেই কর্তব্য পালন করলাম মাত্র। আমার বলার ভাষা ছিল না,হাতখানি অজান্তেই আকড়ে ধরলো তার হাত। বাস এগোতে লাগলো,
আস্তে ওদের চোখের আড়ালে চলে গেলেন তারা,
কিন্তু মন ? তা ওনাদের দুরে ঠেলে কি করে
? মানবিকতার এই জীবন্ত ছবি,
জানিনা ধর্মের প্রাচীর দিয়ে আড়াল করা যায় কিনা
?
এই মানবতাই আজ বড় হয়ে উঠুক ভারতে।
0 comments:
Post a Comment