সম্পাদকের কলমে
নারায়ণ দেবনাথ-
সত্যি বলতে কি একটা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হল। একটা বিশাল বড় অধ্যায়, যেখানে বাবা/ মা, ছেলে/ মেয়ে বা দাদু/দিদা, পিসি, ঠাম্মা সব এক হয়ে গেছিল । চলে গেলেন শরীরের দিক থেকে কিন্তু সারাজীবন রয়ে গেলেন মনে, চোখে আর স্বপ্নে। কার্টুন তাও আবার নিখাদ বাংলা ভাষায়, বাংলা চরিত্র নিয়ে, কিন্তু সেই চরিত্র আবার খুব সাহসী। উনি সাহস দেখিয়েছিলেন বলেই বাংলার ঘরে ঘরে বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা পৌঁছে গেছে। নারায়ণ দেবনাথ -এর প্রতি #গল্পগুচ্ছ এর পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ প্রণাম ।
ভাল থাকবেন, যেখনেই থাকবেন। আমরা কিন্তু আপনার দেশেই রয়ে গেলাম ।
নমস্কার সহ
অঙ্কুর রায়
সংখ্যার সম্পাদক
অভিজিৎ চক্রবর্ত্তী
প্রধান সম্পাদক
লেখা পাঠানোর জন্য
আপনার লেখা পাঠান আমাদেরকে
golpoguccha2018@gmail.com
Total Pageviews
By Boca Nakstrya and Gologuccha . Powered by Blogger.
পরিচয়
অমর ঘোষ
চক্রবর্তী বাড়ির লেটারবক্সে একটা চিঠি এসেছে।অতীন্দ্র লেটারবক্স খুলে চিঠিটা হাতে করে বাড়িতে নিয়ে গেল। অতীন্দ্র হল চক্রবর্তী বাড়ির ছোটো ছেলে। সে ঘরে এসে চিঠিটা তার স্ত্রী অনিতার হাতে দিল।কারণ খামের ওপর প্রথমে 'অনিতা চ্যাটার্জি চক্রবর্তী' র নাম এবং ঠিকানায় অতীন্দ্র চক্রবর্তীর নাম রয়েছে।আজকের যুগে দাড়িয়েও বৈদ্যবাটীর এই চক্রবর্তীরা একটি রক্ষণশীল যৌথ ব্রাহ্মণ পরিবার। এই বাড়ির বেশ কয়েকটা নিয়মের মধ্যে একটা হল বাড়ির সদস্যদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না।কাজেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে ওই চিঠিপত্রেরই আদান প্রদান চলে। তেমনই একটা চিঠি সেদিন অনিতার নামে এসেছিল। চিঠির ঠিকানা টা দেখে অনিতা তো ভীষন আনন্দ পেল।কারণ চিঠিটা আসছে রঘুনাথপুর থেকে।আর রঘুনাথপুর মানেই সে নিশ্চিত তার মামনি চিঠি লিখেছে। মামনি মানে আরতি চ্যাটার্জি হলেন অনিতার একমাত্র মাসি যিনি এই মা মরা মেয়ে অনিতাকে নিজের মেয়ের মত মানুষ করেছেন। আরতি দেবী ও ওনার স্বামী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শিবনাথ চ্যাটার্জি রঘুনাথপুরে থাকেন। এই নিঃসন্তান দম্পতি অনিতাকে অত্যন্ত আদরে বড়ো করেছেন, কোনও দিন তার মা বাবার অভাব বুঝতে দেন নি। অনিতাকে ছোট থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন, লেখাপড়া শিখিয়েছেন। এম এ পাশ করার পর অনিতার জন্য তারা বিয়ের সম্বন্ধ দেখতে থাকেন।শিক্ষিতা,সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং সর্বোপরি গৃহকর্মে পারদর্শী অনিতা কে চক্রবর্তী বাড়ির সবার বেশ পছন্দ হয়। পেশায় ব্যাঙ্ক কর্মী সুদর্শন অতীন্দ্রর সাথে তারপর অনিতার বিয়ে হয়। একেবারে আদ্যন্ত অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হলেও অনিতা ও অতীন্দ্রর মধ্যে কিন্ত ভালোবাসার কোনও ঘাটতি ছিল না। প্রায় দেড় বছর হতে চলল তাদের বিয়ের। কিন্ত সেদিনের সেই চিঠিটা যেন সবকিছু পাল্টে দিয়ে গেল তাদের জীবনে! চিঠিটা পরার পর অনিতা বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। অতীন্দ্র জিজ্ঞেস করাতে সে বলল মামনির শরীরটা বেশ কিছুদিন যাবত ভালো যাচ্ছে না। তাদের কে একবার রঘুনাথপুরের বাড়িতে যেতে বলছেন। এই চিঠির বিষয়টা অনিতা ও অতীন্দ্র বাড়িতে জানায় এবং বাড়ির সকলেই তাদের সময় নষ্ট না করে রঘুনাথপুর যাওয়ার পরামর্শ দেয়। সেইমত তারা চিঠি আসার পরদিনই রঘুনাথপুর যাওয়ার জন্য মনস্থির করে । যাওয়ার সময় তারা বড়োদের প্রণাম জানিয়ে এবং বাড়ির সবার সাথে দেখা করে রঘুনাথপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ট্রেনে যাওয়ার সময়টুকু অনিতার মনে তার মামনির জন্য দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে।তার চোখদুটো ছলছল করছে দেখে অতীন্দ্র অনিতার মাথাটা নিজের বাঁ কাঁধে রেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,চিন্তার কোনও কারণ নেই, আর একটু পরেই রঘুনাথপুর স্টেশন এসে যাবে।তারপর কখন যেন অনিতা অতীন্দ্রর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।কিছুক্ষণ পরে রঘুনাথপুর স্টেশন এলে অতীন্দ্র অনিতাকে জাগায়।এরপর তারা দুজনে স্টেশনে নেমে একটা টোটো গাড়ি ভাড়া করে তার মামনির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই অনিতা একছুট্টে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। অতীন্দ্র ততক্ষণে টোটোর ভাড়া মেটাতে ব্যাস্ত। একটু বাদে অতীন্দ্রও বাড়ির ভিতরে ঢোকে।কিন্ত বাড়িতে ঢুকে সে দেখে তার স্ত্রী অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে।আসলে তারা দুজনেই হয়ত রঘুনাথপুরের বাড়িতে অন্যরকম কিছু পরিস্থিতির কথা অনুমান করেছিল। হঠাৎ করে অতীন্দ্র মামনিকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় দাড়িয়ে থাকতে দেখে একটু যেন হতবাক হয়ে যায়।সে তখন অনিতার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। ততক্ষণে অনিতা জানতে পেরে গেছে যে মামনির কিছুই হয়নি। তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখে অনিতার দুশ্চিন্তা কিছুটা কমে কিন্ত এমন মিথ্যে চিঠি দিয়ে ডাকার কারণ জানাতে চায় মামনির কাছে।মামনি তাদেরকে বলে তারা এত দূর থেকে এসেছে।আগে হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খাওয়া-দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিক, তারপর সবকথা হবে।তাও অনিতা মামনিকে জোর করতে থাকে সত্যিটা বলার জন্য। মামনি তখন বাধ্য হয়ে জানান হ্যাঁ সত্যিই একজন খুবই অসুস্থ এবং মৃত্যুশয্যায় শুয়ে। তিনি অনিতার সাথে দেখা করতে চান, তার সাথে কিছু কথা বলতে চান-এটাই তার শেষ ইচ্ছে।কিছুক্ষণ বাদে অনিতার মেসো ও মামনি এবং অনিতা- অতীন্দ্র ড্রয়িং রুমে একসাথে বসে।তখন অনিতা আসল ঘটনাটা জানতে চায়।কে তাকে দেখতে চান?তখন মামনি বলেন রঘুনাথপুর হাসপাতালের রিটায়ার্ড নার্স পদ্মা ভৌমিক তাকে দেখতে চান। উনি ক্যান্সারে ভুগছেন, লাস্ট স্টেজ।উনি অঁঞ্জলি চ্যাটার্জির মেয়ে অনিতার সাথে দেখা করতে চান, এটাই ওনার শেষ ইচ্ছা। কিন্ত কেন?এই প্রশ্নের উত্তর তিনি একমাত্র অনিতাকেই দিতে চান।পদ্মা দেবী মৃত্যুশয্যায় শুয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো গুনছেন,তাই তারা দেরি না করেই পরদিনই তার বাড়িতে যায়।একটা জরাজীর্ণ খাটের ওপর বয়স্কা পদ্মা দেবী শুয়ে আছেন। মামনি অনিতার সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিতেই তিনি অনিতার হাতদুটো চেপে ধরে বলেন, 'মাগো তুমি আমায় ক্ষমা করো!' অনিতা তখন কিছুটা হতবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার দিকে এবং পদ্মা দেবীকে তার অসুস্থ শরীরের কথা মনে করিয়ে বেশি উত্তেজিত হতে বারন করে।অনিতা তাকে জিজ্ঞেস করে তিনি কি করে তাকে চিনলেন এবং এভাবে ক্ষমাই বা চাইছেন কেন? এত কিছু শোনার পর পদ্মা দেবী অনিতাকে কতগুলো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন? তিনি অনিতার নাম,জন্মতারিখ এবং তার বাবা-মার পরিচয় জানতে চান? অনিতা কিছুটা আশ্চর্য হলেও তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকে। পদ্মা দেবীও নিরবে বিস্ময়ে তার কথা গুলো শুনতে থাকেন। সবকিছু শোনার পর তিনি হঠাৎই বোলে ওঠেন, 'হ্যাঁ এইতো! হাসপাতালের বার্থ রেজিস্টারের সেই মেয়েটার জন্ম তারিখ,বাবা- মায়ের নাম সবই মিলে যাচ্ছে। তুমিই সেই মেয়ে!'
আসলে অনিতা, আরতি চ্যাটার্জির বড়দি অঞ্জলি চ্যাটার্জি এবং জামাইবাবু কর্ণেল প্রতাপ চ্যাটার্জির একমাত্র মেয়ে। অনিতা যখন অঞ্জলি দেবীর ছয় মাস গর্ভাবস্থায় তখন একটা বড়ো দুঃসংবাদ আসে।অনিতার বাবা কর্ণেল প্রতাপ চ্যাটার্জি তখন কাশ্মীর বর্ডারে পোস্টিং ছিলেন। সেই সময় একদল জঙ্গি অনুপ্রবেশ রুখতে অতর্কিত গুলিবর্ষনে প্রতাপ বাবু শহিদ হন। একে অন্তঃসত্ত্বা তারপর স্বামীর এইভাবে চলে যাওয়া, গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন অঞ্জলি দেবী। ক্রমে তার শরীর খুব খারাপ হতে থাকে।দিদির এই অবস্থা দেখে বাধ্য হয়ে একরকম জোর করেই আরতি তার দিদি অঞ্জলি দেবী কে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। আরতির যত্নে তার দিদি কিছুটা সুস্থ হলেও স্বামীর মৃত্যু অঞ্জলি দেবী কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না।ক্রমে এইভাবে চারমাস পরে ১৯৮৫ সালের, ২২শে জুন অনিতার জন্ম হয় রঘুনাথপুর হাসপাতালে।কিন্ত অদৃষ্টের এমনই লিখন যে বাবা মা কারোরই স্নেহ ভালোবাসা ছোট্ট মেয়েটার কপালে নেই। অনিতাকে জন্ম দেবার পরেই হাসপাতালের বিছানায় তার মাও মারা যায়। ছোট্ট মেয়েটাকে নিঃসন্তান আরতি দেবী নিজের কোলে তুলে নেন এবং নিজের মেয়ের মত করে মানুষ করতে থাকেন। তারাই অনিতা নামটি দেয়। অনিতার কাছে তার মাসিই হয়ে ওঠে মামনি। এই ঘটনাগুলো অনিতা নিজেও জানতো। কিন্ত এরপর যেটা সে শুনল তাতে তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল! পদ্মা দেবী রুগ্ন শরীরে ক্ষীণ কন্ঠে আসতে আসতে কিছু কথা বলতে থাকেন। পাশে দাঁড়িয়ে অতীন্দ্র, অনিতার মামনিও সব শুনতে থাকে। সেদিন অনিতার জন্মের সময় দায়িত্বে ছিলেন তিনি অর্থাৎ নার্স পদ্মা ভৌমিক। সেদিন হাসপাতালের একই ওয়ার্ডে দুজন মা সন্তান জন্ম দেবার পর মারা যায়। একজন মৃত সন্তান প্রসব করে মারা যায়। আর একজন কন্যা সন্তান প্রসব করে মারা যায়।অনিতার মা মানে অঞ্চলি দেবী মৃতসন্তান জন্ম দেয়। তার পাশের বেডে একজন কুমারী মা একটা ফুটফুটে মেয়ের জন্ম দেয়।কিন্ত সন্তান জন্ম দেবার পর সেও মারা যায়। সেই বাচ্চাটার বাবাকে আর হাসপাতাল চত্বরে খুঁজে পাওয়া যায় নি। কিন্ত সেদিনের সেই একরত্তি বাচ্চাটার মুখের তাকিয়ে সিস্টার পদ্মা মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেন নি।তিনি ভাবলেন আসল সত্যিটা তো ডাক্তার আর নার্স ছাড়া আর কেউ জানে না।
তাই তিনি ডাক্তারবাবু কে অনুরোধ করেন যে এই মৃত শিশুর জায়গার এই ছোট্ট মেয়েটাকে রেখে দিলে সে একটা সুস্থ সুন্দর জীবন পাবে।অঞ্জলি দেবীর পরিবার তাকে পরম স্নেহে মানুষ করবে।
ডাক্তারবাবু রাজি হলেও খুব সাবধানে কাজটা করতে বলে।ফলে সেইরাতে বাচ্চার অদল বদল হয়। কুমারী মায়ের অবৈধ মেয়েটা আরতি দেবীর কোলে উঠে একনিমেষে বৈধতা পেয়ে যায়। সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটাই আজকের অনিতা।
এই কথাগুলো শোনার পর সবাই এক মুহূর্তে স্তম্ভিত হয়ে যায়। শেষে পদ্মা দেবী অনিতার হাত দুটো নিজের বুকের উপর নিয়ে বলেন, 'মাগো আমাকে ক্ষমা করিস।ন্যায়-অন্যায় জানি না তবে সেদিন তোর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি এই কাজটা করতে বাধ্য হয়েছিলাম।আজ জীবনের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে এইকথাগুলো তোকে না জানিয়ে আমি যে মরেও শান্তি পাবনা।' অনিতা তার বুকের ওপর হাত রেখেই হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে এবং চিৎকার করে বলতে থাকে 'কী আমার আসল পরিচয়!কী আমার আসল পরিচয়!'
অতীন্দ্র সেইসময় হঠাৎই অনিতার মাথার ওপর হাত রেখে বলে, 'তুমি আমার স্ত্রী, এটাই তোমার আসল পরিচয়,এটাই তোমার একমাত্র পরিচয়।সবাই এটাই জানে, চিরকাল সবাই এটাই জানবে।
Subscribe to:
Comments (Atom)
0 comments:
Post a Comment