সম্পাদকের কলমে
লেখা পাঠানোর জন্য
Total Pageviews
অনুরাধা মুখার্জি
আমি ভূতে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনোটাই করিনা।মনের জানালা খুলে রেখেছি , বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত দিয়েও যেমন কপাট বন্ধ করিনি আবার কুসংস্কারের জন্জাল দিয়েও দ্বার রুদ্ধ করে রাখিনি।তবে আমার জীবনে দুটি অলৌকিক অভিজ্ঞতা ঘটেছে--একটি শুভ ও অপরটি অশুভ। এই ঘটনাটিকে আমি কোনো বিশেষ কোটায় ফেলছি না।তবে এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে আমি মেনে নিয়েছি যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "দেবযান" বইটি কোনো সাধারণ উপন্যাস নয়,ওটি বিশেষ চিন্তা ও গবেষণার ফসল।
স্থান চাইবাসার টুংরি পাড়া,কাল ২০০৫এর এপ্রিল মাস। আমি একটি বাড়ির একতলায় ভাড়া এসেছি মাস তিনেক,শর্ত এই যে নির্মীয়মান দোতলা টি কম্প্লীট হলে দোতলায় শিফ্ট করব।ঐ এক উঠোনেই একটি দোতলা বাড়িতে ল্যাণ্ডলর্ড দাসবাবু স্ত্রী কন্যা সহ বাস করেন, তাঁদের পুত্র টি ভুবনেশ্বরে এমবিএ পড়ে। ভদ্রমহিলা আমার প্রাক্তন ছাত্রী আর মেয়েটি তখন আমাদের কলেজেই পড়ে। আমার তখন অবসর নিতে বছর তিনেক বাকি,ঐপাড়ায় যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম,সেটি আমার বড় পছন্দের ছিল, সেখানেই কর্মজীবন শেষ করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সে বাড়িতে দু ভাইয়ের সংসার
পৃথক হলো আর তাই তাদের আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে আমাকে উদ্বাস্তু হতে হলো। এদিকে বছর দেড়েকের মধ্যেই আমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে ও কোমরের হাড় ভেঙেছি তাই অন্য পাড়ায় গিয়ে নতুন করে শুরু করার মতো শক্তি সামর্থ্য ছিল না তাই অত্যন্ত অপছন্দের এই বাসায় কাল কাটাচ্ছিলাম যে দোতলা হলেই উঠে যাব। আমাদের কম্পাউন্ডের একদিকে কবরস্থান, পিছনে ফাঁকা ডিসপ্যুটেড জমি,সামনে সংকীর্ণ রাস্তার ওপাশে এক বাগান বাড়ি,দিনে কখনো সখনো কারো আওয়াজ পাওয়া গেলেও সন্ধ্যা নামার পর কারো আওয়াজ কানে আসত না। আরেকদিকে রাস্তার ওপাশে খাটাল, গরু মহিষের আওয়াজ অবশ্য পাওয়া যেত। পরিবেশ টা আশা করি বোঝাতে পেরেছি, এবার আসল ঘটনায় আসি। এই ঘটনায় একবর্ণ রঙ মেশানো আমার পক্ষে সম্ভব নয় কারণ দাসবাবুরা সপরিবারে আমার ফেসবুকিয় বন্ধু বৃত্তে আছেন ওএই লেখা টি পড়বেন।
সময় আগেই বলেছি এপ্রিল মাস,ঐ সময়ে আমাদের মর্নিং কলেজ হতো তাই আমি খুব ভোরে উঠে রান্না বান্না সেরে নিতাম কারণ বেলা বারোটার পর সাংঘাতিক গরমের মধ্যে বাড়ি ফিরে কিছু করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু সেদিন ভোর রাত থেকেই বাড়িওয়ালা দের বাড়িতে একটা চাপা হৈচৈ টের পাচ্ছি, আমি যখন উঠলাম তখন দেখি স্বামী স্ত্রী কোথাও যাবার জন্য তৈরি,গাড়িও গ্যারেজ থেকে বার হয়ে গেটে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্ন করে জানলাম দাস বাবুর ভাই পাটনায় সপরিবারে থাকতেন,বেশ কয়েকদিন রোগভোগের পর গতরাতে মারা গেছেন। ওঁরা পিঙ্কি কে তার বান্ধবীর বাড়ি রেখে পাটনা যাচ্ছেন বডি আনতে কারণ ওদের পারিবারিক নিয়মানুযায়ী সৎকার হবে পৈতৃক গ্রামের বাড়িতে,চাইবাসা থেকে ঘন্টা দুয়েকের দূরত্বে।যা হোক তাঁরা রওনা হয়ে গেলেন, আমিও কলেজের পথে চললাম। বারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরে দেখি ওদের বাইরের বারান্দায় ডেডবডি শোয়ানো, বরফের স্ল্যাব চাপা আর একটা বড় স্ট্যাণ্ড ফ্যান ঘুরছে আর বাড়ি ভর্তি লোক।
শুনলাম ওঁরা চাইবাসা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলের দৌলতে খবর পান যে বডি নিয়ে স্ত্রী ও দুই ছেলে গতরাতেই চাইবাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে পড়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনারা সোজা সবাই গ্রামে চলে গেলেন না কেন? উত্তর যা শুনলাম তাতে আমার মাথা ঘুরে গেল। মৃতব্যক্তির বড়ো ছেলে খড়গপুর আইআইটিতে পড়ে আগামী কাল বিকেলে তার পরীক্ষা শেষ হবে, তখন পর্যন্ত তাকে কিছু জানানো হবে না।তারপর পরীক্ষা শেষ হলে তাকে জানানো হবে ও সে এলে পরে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে ও সৎকার ও পনেরো দিন যাবৎ অন্যান্য পারলৌকিক কর্ম সম্পাদন করা হবে। আমার অবস্থা বুঝুন এপ্রিলের গরমে পুরো দুদিন ও দুরাত ও বারান্দায় বডি পড়ে রইলো, যে বারান্দা আমার রান্না ও শোওয়ার ঘর দিয়ে অনবরত দেখতে পাচ্ছি,আধগলা বরফ গুলো সব আমার ঘরের জানলার নীচে রাখা হচ্ছে,গলে সেই জল আমার উঠোনে আসছে ,তাই মাড়িয়ে আমি ঘরে ঢুকছি। দ্বিতীয় রাতে ভোর তিনটেয় বড়ো ছেলে এলো ও একঘন্টার মধ্যে বডি নিয়ে সবাই গ্রামের বাড়ি চলে গেল, এবার মিনিমাম পনেরো ষোলো দিনের জন্য অতখানি এরিয়াতে আমি একা।আর আশ্চর্য দুদিন দুরাত বডি যেখানে পড়ে রইলো সেই জায়গা টা পর্যন্ত ধুলো না কেউ,সারা বাড়ির কথা তো ছেড়েই দিলাম।
পরের দিন কলেজ কামাই করে রিকশাওয়ালা ও কাজের মেয়ের সাহায্যে ঐ বারান্দা আর ওদের উঠোন সঙ্গে আমার পুরো বাড়ি ধুলাম, কাজের মেয়েটি আবার পাড়ার কোনো বাড়ি থেকে গঙ্গা জল এনে সর্বত্র ছেটালো।তারপর কাজ কর্ম সেরে চলে গেল,আবার বিকেলে আসবে। এবার আমি নিজের কাজে মন দিলাম। কিন্তু দুপুরের পর থেকে একটা দুর্গন্ধ পাচ্ছিলাম।ঊষা, আমার কাজের মেয়ে টি এসে স্বীকার করলো যে সেও পাচ্ছে।তখন শুরু হলো মরা ইঁদুর খোঁজা।ফিনাইল ঢালা। পরদিন ও প্রচুর সার্চ অপারেশন জারি রাখলাম, পেলাম না কিছু কিন্তু গন্ধ দূর হলো না। পরদিন ম্যুনিসিপাল সুইপার ধরে প্রচুর টাকা খসিয়ে অতবড় বাড়ি, তার চারপাশ, চতুর্দিকের নালা নর্দমা পরিষ্কার করে ডিসিনফেকট্যান্ট ছড়ানো হলো কিন্তু কোনো মৃত পশুর সন্ধান পাওয়া গেল না। তবে দুর্গন্ধ খানিকটা কমল।সদা সর্বদা না পাওয়া গেলেও মাঝে মাঝেই তীব্র দুর্গন্ধে সারা পরিমণ্ডল ভরে যেত। কিন্তু এবার শুরু হলো আরো ভীতিকর কাণ্ড। যখন তখন বাল্ব ফিউজ হতে শুরু করলো।
বাল্ব লাগিয়ে কূল পাই না। মিস্ত্রি ডাকলাম ,সে পরীক্ষা করে জানালো লাইনে দোষ নেই কোনো। একগাদা গাটগচ্চা গেল , কিন্তু এপর্যন্ত ভয় পাইনি তবে একটা অদ্ভুত অনুভুতি হতো মাঝে মাঝে। কিন্তু এবার যা ঘটলো তাতে ভয় না পেয়ে পারলাম না। শোওয়ার ঘরের ফ্যান টা ঘুরে চলেছে, কিছুতেই থামছে না। স্যুইচ অফ, রেগুলেটর অফ, তবুও ফ্যান ঘুরে যাচ্ছে তো যাচ্ছে ই। মিস্ত্রি ভয় পেয়ে মেন স্যুইচ অফ করে পালিয়ে যাচ্ছিল তাকে ধরে এনে পাখার ব্লেড গুলো খুলে রাখালাম।না থাকবে বাঁশ,না বাজবে বাঁশি। কিন্তু এবার কাজের মেয়ে, রিকশাওয়ালা ও ইলেকট্রিক মিস্ত্রি র কল্যাণে সারা পাড়া চাউর হয়ে গেল। এবার পাড়া ও কলেজে সবাই বলে ঐ ভূতুড়ে বাড়ি ছেড়ে তাদের বাড়ি গিয়ে থাকতে। কিন্তু বাবার শিক্ষা ছিল ভয়ের কাছে মাথা নোয়াবি না। একবার যদি মাথা নত করেছিস তাহলে আর মাথা তুলতে পারবি না। আমিও সেই নীতি মেনে বললাম প্রত্যহ সন্ধ্যা র সময়ে পাড়ায় কারো না কারো বাড়ি গিয়ে ঘন্টা দুতিন কাটিয়ে বাড়ী এসে খেয়ে শুয়ে পড়ব।
তাই চলছিল,তবে বাড়ি এসে খেতে হতো না,যার বাড়ি যেতাম সেই রাতের খাবার খাইয়ে বাড়ি পৌঁছে দিত তবে ঐ আমার তালা খুলে বাড়ি ঢোকা পর্যন্ত, আমার বাসায় ঘরের ভিতরে আসার সাহস রাত্রি বেলা একজন ও দেখায় নি। এইবার আসি আমার নিজের অনুভূতি তে। বাড়িতে একটা কর্নার টেবিলে বাবা-মায়ের ফটো থাকত,আজো থাকে,আমি সন্ধ্যা বেলা সেখানে একটা মোমবাতি ও ধূপকাঠি জ্বালাতাম। একদিন কিছুতেই আর জ্বালাতে পারছিনা,মনে হচ্ছে পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে। আমার কি মনে হলো জানিনা আমি পিছনে ঘুরে বললাম "আমাকে তুমি ভয় দেখাচ্ছ কেন? আমি তোমার কোন ক্ষতি করিনি। আমি তোমার কষ্ট বুঝি,এই বয়সে তিনটে বাচ্চা বাচ্চা ছেলে, সবকটি ছাত্র,কেউ মানুষ হয়নি এখনও, তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে ভাসিয়ে দিয়ে আচমকা চলে যেতে কোন বাবার না বুক ভেঙে যায়। কিন্তু আমার কী করার আছে বলো, আমি তো আগে তোমাদের দেখা তো দূরের কথা তোমাদের কথা শুনিনি পর্যন্ত।
তাই আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে চলেছ কেন?"আশ্চর্য এই যে আমার মনে হলো আমার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ যেন চুপ করে শুনল। পরদিন থেকে সন্ধ্যা বাতি জ্বালাতে কোনো অসুবিধা হয় নি তবে সেই সময় কারো উপস্থিতি অনুভব করতে পারতাম। দেখতে দেখতে ভদ্রলোকের শ্রাদ্ধের দিন এসে গেল, সেদিন ছিল মঙ্গলবার। আমি কলেজ থেকে দুপুর বেলা ফিরে দেখি, দাস বাবুর খবরের কাগজ গুলো (একটা ওড়িয়া ও অপরটি হিন্দি)আমি দুটো থাকে পাথর চাপা দিয়ে রেখে দিতাম ঐ বারান্দার নীচের সোপানে, সেই কাগজ গুলো সারা উঠোনে ছড়িয়ে রয়েছে। অথচ তখন পর্যন্ত একটু হাওয়া ও ওঠেনি।যাই হোক সাহস হলোনা ভরদুপুরে একা একা কাগজ গুলো কুড়িয়ে গুছিয়ে রাখার। বিকেলে ঊষা এলে জিজ্ঞেস করলাম যে আমার অনুপস্থিতিতে ও এসেছিল কিনা, কাগজ গুলো এরকম কি করে হলো?ঊষা তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ঝঙ্কার দিয়ে বলে উঠলো তুমি না থাকলে এই ভূতের বাড়ি কে আসবে? তুমি নিজে ভূত,তাই এই ভূতের বাড়িতে পড়ে আছো,অন্য কেউ হলে থাকত না। আমি তখন বললাম আর ভয় নেই,শ্রাদ্ধ হয়ে গেছে,ও বুঝতে পেরেছে যে ও আর এই জগতের নয়।
এতদিন ও বুঝতে পারছিলো না,ওর দেহ খুঁজে ফিরছিল।আজ বুঝেছে এ জগতে ও অনাকাঙ্ক্ষিত তাই চলে গেছে, যাওয়ার আগে কাগজ এলোমেলো করে জানিয়ে গেছে।আরো দুতিন দিন পর দাসবাবুরা ফিরলেন। দুদিন পর আমি শ্রীমতি দাসকে বললাম যে আমি গরমের ছুটি র পর এ বাসা ছেড়ে দেব। পাড়ায় অন্য বাড়ি তে দু'টো ঘর পেয়েছি। অবাক হলাম ভদ্রমহিলা আমাকে শুধু বললেন আমি একটা পূজো দেব,তাতে আসবেন তো? আমি বললাম পাড়াতেই তো থাকবো, তুমি যখন ডাকবে তখনই আসব। সন্ধ্যা বেলা এলেন সপুত্র দাসবাবু, বললেন"কি দোষ করলাম দিদি যে আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন?"ভয়ের কথা তো বলা যায় না,তাই বললাম ওপরতলা কম্পলিট হলো না, বর্ষা এসে যাবে আর তখন নীচতলায় থাকতে পারব না।উনি বললেন আপনি গরমের ছুটির পর ওপরতলাতেই থাকবেন।আর তেইশে মে বুদ্ধপূর্ণিমা, সেদিন একটা পূজো দেব,তারপর শুদ্ধ হয়ে বাড়ি যাবেন,তার আগে কোথাও যাবেন না।তাই হলো ,হোমযজ্ঞ করে পূজো হলো।
তখন শুনলাম গ্রামের বাড়ি তেও প্রত্যেকে ভয় পেয়েছে আর সবাই আমাকে নিয়ে চিন্তা করেছে যে একা আমি কি করে আছি!যা হোক পূজো শেষে শান্তি জল ও প্রসাদ নিয়ে কলকাতা যাত্রা করলাম। ছুটির শেষে ফিরে এলাম যখন, তখন দোতলা কমপ্লিট,গৃহপ্রবেশের পর উঠে এলাম ওপরে।আর২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে ওখান থেকেই ফাইনালি চাইবাসা ছেড়ে রিটায়ারমেন্টের আরো একবছর পর কলকাতা চলে এলাম,আর একদিনের জন্য ও কখনো ভয় পাইনি।২০১৬পর্যন্ত যখন ই চাইবাসা গিয়েছি, ও বাড়িতে গিয়েছি,একাধবেলা থেকেছি, কখনো অন্য কোন রকম অনুভুতি হয় নি।
তাই এই ঘটনা কে কোন পর্যায়ে ফেলব আমি জানিনা। আমার খালি দেবযানের কথা মনে হয়, যতীন ও তো মৃত্যুর পর বুঝে উঠতে পারছিলো না, যতক্ষণ না পুষ্প এসে তাকে নিয়ে গিয়েছিল।এই ভদ্রলোক কে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কেউ ছিল না।আর মৃত্যুর আগে অনেকেই মৃত আপনজন কে দেখতে পাওয়ার কথা বলেন, হয়তো সত্যি তাঁরা আসেন আপন জন কে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যাতে এই ভদ্রলোকের মতো তাঁদের পথভ্রষ্ট হতে না হয়।এই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার সঙ্গে ই শেষ হলো আমার অলৌকিক অনুভূতির ভাণ্ডার।

0 comments:
Post a Comment