সম্পাদকের কলমে
লেখা পাঠানোর জন্য
Total Pageviews
গোয়েন্দা পিলু
সুরজিৎ দেব রায়
পিলু এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। ইন্দ্রজিৎ মিত্র ওরফে পিলু। স্কুল থেকে ফিরে হাত-পা-মুখ ধুয়ে, সামান্য কিছু খেয়ে যে দৌড় লাগাবে তার উপায় নেই। মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া রোজ রোজ সম্ভব হয় না। মায়ের ধমকে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে পিলু। আর যে মুহূর্তে মা এদিক ওদিক কোনও কাজে গেল তো, সেই সুযোগে পিলুর কাজও শুরু হয়ে যায়। কতরকম কাজ। আর কাজ যারা করে তাদেরই তো ভুল হয়। পিলুর হাত লেগে কত কিছু যে ভেঙ্গেছে তার ঠিক নেই, ঠিক সময়ে অনেক কিছু যেমন খুঁজে পাওয়া যায় না, খুঁজে পাওয়াই যায় নি এরকম বহু অভিযোগ জমা হয়েছে পিলুর বিরুদ্ধে। কিন্তু যা-ই ঘটুক ঠাকমার ভয়ে কেউ পিলুকে বকুনি দিতে পারে না। ঠাকমা সবসময় পিলুকে আগলে আগলে রাখে, পিলুর প্রশংসায় ঠাকমা পঞ্চমুখ, কেউ কিছু বলার আগেই পিলু পৌঁছে যায় ঠাকমার কাছে। পিলুর সবচেয়ে বড় ঢাল হল, লেখাপড়া নিয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করতে পারবে না। বাবা, মা, দিদি, মেজকা,মেজকাকি, মেজকার ছেলে দাদা, ছোটকা কেউই পড়াশুনা নিয়ে ওকে আজ পর্যন্ত বকুনি দিতে পারে নি। স্কুলের মাস্টার মশাইরাও ওকে খুব ভালবাসে। প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময় থেকেই পিলু বাড়ীতে দিদির সাথে পড়তে অভ্যস্ত। টেবিলের যে চেয়ারে দিদি বসে, তার বাঁদিকের চেয়ারে বসে পিলু। দিদি বাসন্তী মিত্র, এখন টেনে পড়ে, পরের বছর মাধ্যমিক দেবে। বড় স্কুলে ভর্তি হয়েও পিলু দিদির সাথেই পড়তে বসে। পিলুর প্রায় সব বন্ধু প্রাইমারী স্কুল থেকে বড় স্কুলে ভর্তি হয়েছে। পিলুর অনেক বন্ধু, তার মধ্যে ঘনিষ্ঠ হল তিনজন- জহর, অমল, ফিরোজ । এই চারজন সেই প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময় থেকে একই রাস্তা দিয়ে এক সঙ্গে যাওয়া আসা করে, রোজ বিকালে একই মাঠে খেলে, ঘুড়িও ওড়ায়। স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রথমে অমলের বাড়ি , তারপর জহর, পিলুর এবং তারপর ফিরোজের বাড়ি। ওরা স্কুলে যাওয়ার সময়ও একজন অন্যজনের জন্য বাড়ীর বাইরে অপেক্ষা করে, তারপর চারজন এক সঙ্গে স্কুলে ঢোকে। কোনও কারণে কেউ স্কুলে যেতে না পারলে তার বাড়ীর কেউ খবর দিয়ে দেয়।
স্কুলের পড়ার বইয়ের বাইরের অনেক বই পিলুর পড়া হয়ে গেছে। পিলু যখন থ্রীতে পড়ত সেই সময় থেকেই পিলুর দিদি নতুন নতুন বই কিনে এনে দিয়েছে, সেই থেকে বইও পিলুর বন্ধু। নতুন বই পেলে পিলুর একটাই কাজ, বইটা পড়া আর পরের দিন বন্ধুদের শোনানো, মাঝে মাঝে দিদি, মা, ঠাকমাকেও শোনায়। বইয়ের যত্ন নেওয়া পিলু ওর দিদির কাছেই শিখেছে। যেহেতু পিলু লেখাপড়ায় কোনও ফাঁকি দেয় না, স্কুল থেকেও ওর বিরুদ্ধে কোনও রিপোর্ট নেই, বই পড়ার ঝোঁক যত বাড়ে অন্য কাজে পিলুর হাতও পড়ে না, জিনিসপত্র ভাঙ্গে না, হারায় না, তাই বই পড়ার পছন্দ অপছদ নিয়ে কেউ কিছু বলতেও পারে না পিলুকে। তার মধ্যে কয়েকটা বই পিলুর দিদি আলমারিতে তূলে রেখেছিল, এখনও মাঝে মাঝে সেগুলি বে’র করে পিলু বন্ধুদের দেখায়, খুব ভালো লাগে। বন্ধুদের কারোর কাছেই এতো বই নেই। বই পড়তে যে পিলু সবচেয়ে বেশী ভালবাসে এটা যারাই জেনেছে, পিলুর জন্মদিনে বা অন্য যে কোনও সময় পিলুকে তারা বই উপহার দিয়েছে। এভাবে দিদির আলমারির অর্ধেকটা পিলু দখল করে ফেলেছে। শুধু তো গল্পের বই নয়, নানারকম বিষয়ের বই আছে ওর আলমারিতে। ওগুলো পড়ে কত অজানা জিনিস যে পিলুর জানা হচ্ছে তার হিসাব নেই। সেসব বই পড়ার পর পিলু বন্ধুদের কাছে গল্প বলে, নানারকম মজাদার ঘটনা বলে। বন্ধুদের কাছে পিলুর আকর্ষণ সেখানেই। পিলু গল্প বলে, আর বন্ধুরা বিস্ময়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। দিদির সঙ্গে কথা বলে, ,মায়ের উৎসাহে পিলু মাঝে মাঝে বাড়িতে বন্ধুদের নিয়েও এসেছে। বন্ধুরা ওর বইয়ের ভাণ্ডার দেখে অবাক হয়েছে। দিদির মতো পিলুও মজা করে নানারকম প্রশ্ন করে বন্ধুদের, জানে কেউ উত্তর দিতে পারবে না, তারপর পিলুই সেসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। হঠাৎ কয়েকটি ডিটেকটিভ ও রহস্যপূর্ণ বই পিলুর হাতে পড়ল। তারপর থেকে ওই জাতীয় বইয়ের দিকে পিলুর আকর্ষণ বেড়ে গেল। শুরুতে বড়দের মধ্যে কেউ কেউ ওই বই পড়ায় আপত্তি তুলেছিল, বরং ঠাকমা বলেছে – “ ডিটেকটিভ বা রহস্য বই পড়ে তো পিলু ভয় পাচ্ছে না তাহলে ওকে বারণ করা কেন ? ওকে যারা বই দেয় তাদেরই তো সাবধান হতে হবে যাতে পিলুর হাতে কোনও খারাপ বই না যায় “ ।
ডিটেকটিভ বই পড়তে পড়তে পিলু এখন নিজেকে গোয়েন্দা ভাবতে শুরু করেছে। বন্ধুদের কাছে পিলু এখন আগের থেকে অনেক সম্মানীয়। বাড়ীতে কারোর কোনও কিছু হারিয়ে গেলে, বা বাড়ীর কাজের কোনও জিনিস হারিয়ে গেলে এখন পিলুর ডাক পড়ে।এসব গল্প বন্ধুদের কাছে পিলু বলেও, আর বন্ধুরাও খুব অবাক হয়ে যায়।
সেই পিলুর কাছে ওর ছোটকা হল বিস্ময়ের মানুষ। ছোটকা -- বিশ্বজিৎ মিত্র, কলেজে পড়া শেষ করে চাকুরীর জন্য মাঝে মাঝেই পরীক্ষা দিতে যায়। পিলু যখন খুব ছোট্ট, ছোটকার কোলে, কাঁধে পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, ছোটকা সাইকেলে করে অনেক জায়গায় নিয়ে গেছে এসব কথা পিলু শুনেছে, দিদির কাছে, ঠাকমার কাছে, মায়ের কাছে, বড়দের কাছে, পিলুর কিছু মনে পড়ে না। পিলুর মনে পড়ে বাড়ীর কাছে ওই বিশাল মাঠটায় ছোটকা ফুটবল খেলত । ছোটকা যখন বল পায়ে পেত, মাঠের চারধার থেকে সে-কি চিৎকার, গোল, গোল গোল। তারপর কোনও সময় বলটাকে গোলপোস্টের ভেতরে জালের মধ্যে ঢোকালে চিৎকার করতে করতে মাঠের ভেতরে ঢুকে ছোটকাকে কাঁধে তূলে মাঠের চারিদিকে ঘুরে বেড়ানো। পিলুর মনে হতো ঠাকমা ছাড়া ছোটকাকে বাড়ির সকলেই ভয় করে চলত । আর ছোটকা পিলুর বাবাকে সমঝে চলত। পিলুর বাবা প্রসেনজিৎ মিত্র, কলকাতা সিটি কলেজের ইংরাজীর অধ্যাপক। পিলু শুনেছে ছোটকা ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল। রোজ ক্লাবে যাওয়া, আড্ডা মারা, বাড়িতে ফিরলে ঠাকমার ধমক খাওয়া এগুলো পিলুর মনে পড়ে। ছোটকা মাঝে মাঝে মাছ শিকার করতে যেত। পিলুর মনে পড়ে বাইরে অন্ধকার থাকতে ছোটকা মাছ ধরতে চলে গেছে দিদি সদর দরজা খুলে দিয়েছে। ছোটকার সঙ্গে আরও দুজন বন্ধু যেত। সন্ধ্যার আগে থেকেই পাড়ার আশেপাশের, ক্লাবের ছেলেরা খোঁজ করতে আসত, ছোটকা ফিরেছে কি, না। ওরা তিনজন একসঙ্গে প্রথমে এবাড়িতেই উঠত। তিনজনের সঙ্গে জাল ভর্তি অনেক মাছ, সারাদিন ধরেছে। বাড়ীর জন্য কয়েকটা মাছ রেখে বাদবাকি অন্যদের দিয়ে দিত ওরা। এসব ঘটনা পিলুর মনে গেঁথে আছে।
ছোটকা বলত, “ পিলু কাল মৎস্য শিকার করতে যাচ্ছি বুঝলি, খুব কঠিন, ভীষণ ধৈর্য লাগে, তোর তো ওই ধৈর্যটাই নেই, সবসময় ছটফট করিস। বাঘ, সিংহ, হরিণ, পাখী এগুলো শিকার করা তো সোজা, ওদের চোখে দেখা যায়। বন্দুক হাতে নিয়ে, ঠিক মতো নিশানা করো, ব্যস গুলি ছুটল। ঝাউতলার ঝিলটা দেখেছিস তো কি গভীর, ওই গভীর জলে কোথায় কোথায় মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে তাকে ধরা, বড়শি ফেলে ফাতনার দিকে চেয়ে থাকো, মাছ বড়শির ধার থেকে একটু একটু করে খাবার খেয়ে পালাবে, এগুলো বুঝতে হবে, কখন বড়শিটা টানতে হবে, আর বড়শিটা ওর মুখে আটকে গেলে মাছটা এবার ছুটবে, খালি ছুটবে। জলে যতক্ষন মাছ থাকে ওদের প্রচণ্ড শক্তি, কতজনের বড়শিটাই ছিঁড়ে গেছে। তাই মাছটাকে জলের মধ্যে ছোটাছুটি করাতে হবে, খেলাতে হবে যতক্ষণ মাছটা ক্লান্ত না হয়। আর বড়শিটা আটকে থাকায় মাছটা তো ব্যথাও পায়, তাই একসময় ওর দম ফুরিয়ে যায় তারপর আস্তে আস্তে মাছটা কাছে এলেই জালের মধ্যে আটকে নিতে হবে। আর যে কোনও বড়শি দিয়ে যে কোনও মাছ ধরা যায় না। ছোট বড় নানান সাইজের বড়শি আছে, নানান রকম ছিপ আছে। আবার বড়শি দিয়েই তো সব মাছ ধরা যায় না, নানান রকম জাল আছে। বর্শা ছুঁড়েও মাছ ধরা যায়, খুব কঠিন ধরা। জলের ভেতর মাছটা ঘুরে বেড়াচ্ছে, হাতে বর্শা নিয়ে ঠিক নিশানা লাগিয়ে মাছ ধরতে আমি দেখেছি অনেক বার”।
পিলু সেসব গল্প অবাক হয়ে শুনত। মাছ ধরার নানান রকম জাল হয়, তারপর বাঁশের শলা দিয়ে বিভিন্ন ধরণের চাঁই বানিয়ে খালের জলের স্রোতের বসিয়ে রাখা হয়, একদিকে মাছ ঢুকে গেলে আর বেরোনোর উপায় নেই, এগুলো দিয়ে চুনো জাতীয় মাছ ধরা হয়। ছোটকা যে মাছ ধরার প্রোগ্রাম করছে কয়েকদিন আগে থেকেই তার তোরজোড় চলতো। মাছের চারা বানানোর জন্য পিঁপড়ের ডিম, লাড্ডু, পাউরুটি , ছোট ছোট শিশিতে ওষুধ ইত্যাদি নিয়ে আসত ছোটকা, পিলুকে কাছে ঘেঁষতে দিত না। বিভিন্ন সাইজের চারটে ছিপ ছিল ছোটকার, দুটো ছিল হুইল ছিপ। বন্দুকের মতো কাঁধে ফেলে ছোটকা বলত, “ কাল মৎস্য শিকারে যাচ্ছি, বুঝলি, তুই তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যা, তোকেও নিয়ে যাবো, তবে ওই যে বললাম ধৈর্যশক্তি বাড়াতে হবে”।
সেই ছোটকা এখন ফরেস্ট অফিসার হবার ট্রেনিংএ চলে গেছে সেই আসামে। তিন বছর ট্রেনিং,তারপর চাকুরী, ঘুরে বেড়াবে ভারতের বিভিন্ন জঙ্গলে। জঙ্গল না বাঁচলে বৃষ্টি হবে না, চাষবাস বন্ধ হয়ে যাবে, খাওয়ার জলও পাওয়া যাবে না। এখন জঙ্গল বলে না, বলে অভয়ারণ্য। পিলু এসব বইয়ে পড়েছে।দামী দামী গাছ আর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এগুলোর দায়িত্ব থাকবে ছোটকার ওপর।ছোটকা ট্রেনিংএ চলে যাওয়ার পর এখন ছোটকার ঘরে দিদি আর পিলু দুবেলা পড়তে বসে। ঠাকমাই বলে দিয়েছে।
গত পুজার ছুটিতে ছোটকা বাড়ীতে এসেছিল, কতরকম গল্প। পিলু ওসব গল্প এতদিন বইয়ে পড়ে এসেছে। ছোটকা যেখানে থাকে সেখানে রাতের বেলায় বাঘের গর্জন শোনা যায়। চিতাবাঘকে তো কোয়ার্টারের উঠানে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে ছোটকা। হাতি দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এরকম দৃশ্য প্রায় যে কোনও সময় দেখা যায়। ছোটকা এখন বন্দুক, রিভলবার চালায়, আসামের কোয়ার্টারে রেখে এসেছে। পরের বার আনবে, এবার আনতে ভুলে গেছে। ছোটকা পিলুর চোখে বীরপুরুষ। বইয়ের পাতায় পিলু দেখেছে বন্দুক হাতে একজন রাজা দাঁড়িয়ে আছে, আর পায়ের কাছে বাঘ পড়ে আছে, ওই বাঘটাকে রাজা নিজেই মেরেছে। আবার বাঘের সঙ্গে খেলছে এরকম ফটোও পিলু দেখেছে। পিলু ভাবে ছোটকাকেও এরকম কোন ফটোতে একদিন দেখা যাবে, পিলু একথা ওর বন্ধুদের বলেছে। ছোটকা ট্রেনিংএ চলে যাওয়ার পর এখন আর আগের মতো মাছ ধরার হইচই হয়না। বাজার থেকে বাবা, নাহলে মেজকা কেউ মাঝে মাঝে মাছ আনে। টাটকা মাছ খেতে হলে রোজ বাজারে যেতে হয়, সেখানে রোজ বাজারে যাওয়া হয় না। তবে প্রায়ই রাস্তা দিয়ে মাছ বিক্রি করে এমন ফেরিওয়ালার দেখা পাওয়া যায়। তার মধ্যে তিনজন প্রায়ই এবাড়ির দরজায় এসে হাঁক পারে। ওই হাঁক শুনলে পিলু যেখানেই থাকুক ছুটে আসে, মাছওয়ালাকে দাঁড়াতে বলে বাবাকে খবর দেয়। পিলুর আকর্ষণ হল মাছগুলোকে চাক্ষুষ দেখা। মাছওয়ালারাও সেটা বুঝে গেছে, ওড়াও সাইকেল থেকে মাছের ড্রামটা নামিয়ে মাটিতে রাখে। কতরকমের যে মাছ হয় পিলু ধীরে ধীরে বুঝতে থাকে। এদের মধ্যে কোনটা কোনটা বড়শি দিয়ে ধরা হয়েছে প্রশ্ন করতে, পিলু জানল বেশী পরিমাণে মাছ বড়শি দিয়ে ধরা যায় না, জাল দিয়ে ধরতে হয়। মাছ নিয়ে ব্যবসা করা, আর মাছ শিকার করা যে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস পিলু সেটা বুঝতে পারল। দিদিকে সে কথাটা বলতে উত্তরে দিদি বলল এটা তোর গোয়েন্দাগরি করে জানতে হল পিলু ? তুই এবার থেকে ওই গোয়েন্দাগিরি করা ছেড়ে দে, সব ব্যাপারেই তোর গোয়েন্দার দৃষ্টি। এজন্যই বাড়ীর কেউ তোকে পাত্তা দেয় না। মেজকার ছেলে বিক্রমজিৎ অর্থাৎ পিলুর দাদা ওকে খুব ক্ষ্যাপায়। এজন্য পিলু দাদাকে প্রায় সময় এড়িয়ে চলে। দাদা এখন এইটে পড়ে। দিদি, দাদা আর পিলু মাঝে মাঝে একসঙ্গে খেললেও , দাদার সঙ্গে পিলুর খুব একটা ভাব হয়নি। তার মুলে পিলুর গোয়েন্দাগিরি।
দিদি প্রায়ই বলে, “পিলু তুই একটা ভালো কেস সলভ কর, ভালো কেসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়”। পিলু খুব দুঃখ পায়।
“আরে তুই দুঃখ পেলি, গোয়েন্দাদের কত কথা শুনতে হয়, ওরা ও সব কথায় কানই দেয়না। গোয়েন্দারা নিজের কাজ করেই চলে”। পিলু গম্ভীর হয়ে যায়। গোয়েন্দাগিরিতে বন্ধু মহলে পিলুর খুব সম্মান, দিদির কাছে এলেই কিসব গণ্ডগোল হয়ে যায়। ছোটকা আসছে কয়েকদিনের ছুটিতে। বাবাকে ফোন করে জানিয়েছে। মা দিদিকে বলেছে একদিন সময় করে ছোটকার ঘরে মাকড়সার ঝুল ভালো করে ঝাড়তে হবে।
পিলু জিজ্ঞেস করে, “ তাহলে কি আমরা আর এঘরে পড়তে বসবো না”?
“ মা তো সে কথা বলেনি, আর এঘরে পড়তে বলেছে তো ঠাকমা, ঠাকমাও তো কিছু বলে নি। আমার মনে হয় ছোটকা এঘরে আমাদের পড়তে দেখলে খুশীই হবে, ঘরটা ব্যবহার হলে পরিস্কার থাকে”।
পিলু চুপ করে যায়। প্রতিদিনই দিদি পিলুর আগে পড়তে চলে আসে। সেদিন ঘরে ঢুকতেই পিলুকে ওর দিদি বলল, “ ঘরের ঝুলটা ঝেড়ে নিই, তুই বাইরে দাঁড়া, মাথায় ময়লা পড়বে”।
দিদি একটা চেয়ারে ওপর দাঁড়িয়ে ঝুল পরিষ্কার করছে। পিলু ঘরের চারিদিকে চোখ বোলাচ্ছে। গোয়েন্দাদের চোখকান সজাগ রাখতে হয়, ওটাই ওদের প্রধান হাতিয়ার। ঘরের কোণে নজর পড়তেই পিলু চমকে উঠল। ছোটকার ছিপগুলো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চারটের জায়গায় তিনটে? একটা হুইল ছিপ নেই। পিলু আবার গুনল। না, একটা নেই।
পিলু আর থাকতে পারল না,” দিদি ছোটকার একটা হুইল ছিপ নেই” । এবার দিদিও গুনল, “এ্যাঁ, সে কিরে পিলু”?
কথাটা প্রথমে শুনল ঠাকমা, তারপর মা, কাকিমা, একে একে সবাই। ছোটকার ঘরের খাটের তলা থেকে শুরু করে সর্বত্র খোঁজাখুঁজি করেও সেই ছিপের হদিশ পাওয়া গেল,না। দাদা আবার পিলুকে ক্ষ্যাপাবার জন্য বলল, “ ভাই হয়তো ওটাকে একটা লাঠি বানিয়ে খেলা করতে গিয়ে ভেঙে ফেলেছে। কাউকে বলেনি এতদিন এখন ছোটকা আসবে তাই ও এখন কারোর ঘাড়ে দোষ চাপাবার চেষ্টা করছে”।
“না, আমি ভাঙ্গিনি”- পিলু চিৎকার করে উঠল।
তবে দাদার কথা কেউ বিশ্বাস করেনি, সবাই খুব মজা পেয়েছে, দিদি চোখের ইঙ্গিতে আর মুখে আঙুল দিয়ে পিলুকে শান্ত থাকতে বলেছে। তখনকার মতো চুপ করে গেলেও পিলুর মন শান্ত হচ্ছে না কিছুতেই। ছোটকার ছিপ হারিয়ে গেল, পিলুর ভীষণ মন খারাপ। স্কুলে গিয়েও পিলুর মনের মধ্যে ওই ছিপটা উঁকি দিচ্ছে বারবার। বন্ধুদের সঙ্গে সেদিন হইচই করতে ভালো লাগল না।
কার দরকার পড়ে ছিপের ? উত্তর -- মৎস্য শিকারীদের। তাহলে ছোটকা বাদে আর কে কে মৎস্য শিকারে যায় ? পিলুর মনে পড়ছে ছোটকা চলে যাওয়ার পর শ্যামলকাকু দুবার মৎস্য শিকারে গিয়েছিল এবং দুবারই বাড়ীতে এসে মাছ দিয়ে গেছে। প্রথমবার মৎস্য শিকারে যাওয়ার আগে শ্যামলকাকু ঠাকমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। ঠাকমার ঘরে অনেকক্ষণ ছিল। তাহলে এরকম তো হতে পারে শ্যামলকাকু ঠাকমাকে বলে ওই ছিপটা নিয়ে গেছে , ফেরৎ দিতে ভুলে গেছে। পিলু কথাটা দিদিকেই বলল প্রথম।
দিদি শুনে বলল, “ তোর এই পর্যবেক্ষণটা মনে হচ্ছে এক্কেবারে ঠিক। চল তোর অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে যাই। গোয়েন্দাদের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকে”।
পিলুকে সঙ্গে নিয়ে দিদি এবার সটান ঠাকমার কাছে। শেষ পর্যন্ত শ্যামলকাকুর কাছেই ওই ছিপটা পাওয়া গেল। ছোটকা এসেছিল, কয়েকদিন এবাড়ীতে হইচই করে কাটল। ছিপ হারিয়ে যাওয়া এবং পিলু কীভাবে তা উদ্ধার করল শুনে ছোটকা পিলুর গোয়েন্দাগিরির খুব প্রশংসা করল। আর পিলুও একটা নতুন গোয়েন্দার বই উপহার পেল। ছোটকা দিয়েছে। ছোটকা এবার রিভলবারটা নিয়ে এসেছিল পিলুকে দেখিয়েছে। ছোটকা বলে গেছে পিলু বড় হলে জঙ্গলে নিয়ে যাবে। বাঘ, সিংহ, ভালুক, বাইসন, গণ্ডার, হাতি, হরিণ কতরকম জন্তু জানোয়ার সামনাসামনি দেখা যাবে। ময়ূর হাত থেকে গম, ছোলা খেয়ে যাবে।
দিন যায়, স্কুলের এ্যানুয়ালি পরীক্ষা হয়ে গেছে। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে দিন পনেরো পরে। রুটিন ধরে পিলুর এখন কিছু করার নেই।
আর দুই মাস পরে দিদির মাধ্যমিক পরীক্ষা।ওনেক ভোরে উঠে দিদি পড়ায় ডুব দেয়। সকাল বেলা দিদির পাশের চেয়ারটায় বসে পিলু পুরানো গল্পের বইগুলি আবার পড়ছে, ব্যস ভালো লাগে, মজা লাগে, যেগুলো ভুলে গিয়েছিল, সেগুলো মনে পড়ে যায়। তবে এখন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না হওয়ায় গল্প করা হয়ে উঠছে না। দিদিকেও কিছু বলা যাবে না। দিদি পড়ায় ব্যস্ত। আর ছুটিতে দাদা গেছে ওর মামার বাড়ীতে। সেদিন রবিবার। সাধারণত রবিবার এবাড়িতে কোনও মাছওয়ালা আসে না। সবাই জানে কেউ না কেউ বাজারে যায় ওই দিন। এক মাছওয়ালা রাস্তা দিয়ে হাঁক পেরে যাচ্ছিল, শুনতে পেয়ে বাবা চিৎকার করে ওকে দাঁড়াতে বলল। পিলুও ছুটল। বাবার সেদিন খুব জরুরী কাজ থাকায় বাজারে যাবে না বলে রাতে বলেছিল।
মেজকা, চিরঞ্জিত মিত্র, কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ দফতরে কাজ করে, এখানে সেখানে বদলী হতে হয়। সেই মেজকা তিনদিন আগে অফিসের কাজে পাটনা গেছে। আরও দুদিন পড়ে ফিরবে। তাই মাছওয়ালা এসে পড়ায় সুবিধেই হল। বাবা বাইরে এসে মাছ পছন্দ করে, ওজন দেখে কাটতে বলে গেল। পিলু ততক্ষণে ওর মাছ নিয়ে গবেষণা শুরু করে দিয়েছে। মাছ প্রায় কাটা হয়ে গেছে এমন সময় বাবা হন্তদন্ত হয়ে বাইরে এসে বলল, “ তুমি তাহলে মাছ কাটা হয়ে গেলে একটু হাঁক মেরে বাড়ীর কাউকে দিয়ে দিও, পিলুর হাতে দিও না, ওত ভারী জিনিস পড়ে যাবে, নষ্ট হয়ে গেলে খাওয়াই হবে না। আমি চলি”।
বাবা একটু এগোতেই মাছওয়ালা বলল, “বাবু মাছের দামটা”?
বাবা থমকে দাঁড়াল, “তখন যে দাম দিলাম, তিনশ টাকা দিলাম”।
“না, বাবু দ্যাননি, আমি মিছে কেন বলব”?
“দাঁড়া, দেখি তো” । বাবা মানিব্যাগ বের করে টাকা গুণতে থাকে, “এই তো দেখছি তিনটে একশ টাকার নোট নেই, দাম তো দিলাম। আবার চাইছো? তুমি মাছ নিয়ে চলে যাও, দিতে হবে না। তোমার সঙ্গে বকবক করার সময় নেই আমার”।
“বাবু কাটা মাছ নিয়ে কোথায় যাবো”?
“যেখানে খুশী যাও”
বাবা ঘড়ি দেখতে দেখতে হনহন করে চলে যায়। মাছওয়ালা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। শুরু থেকেই পিলু সেই যে এখানে এসেছিল আর যায়নি, সব কিছুর ওপর নজর রেখেছে । মাছওয়ালা বাদবাকি মাছ কেটে বটিটা দুরের পুকুর থেকে ধুয়ে নিয়ে এল। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল, দু-একবার চোখের জল মুছল, তারপর বলল, যাও খোকা কাউকে ডেকে আনো, মাছগুলো দিয়ে যাই। পিলু এবার সেখান থেকে উঠল, এক দৌড়ে দিদির কাছে। দিদি তখন এক মনে বই পড়ছে। দিদির পাশে চেয়ারটায় জোরে শব্দ করে পিলু বসে পড়ল। পিলু যে কিছু বলতে এসেছে এটা বুঝতে দিদি বেশী সময় নেয়নি। “কি রে কিছু বলবি মনে হচ্ছে”? দিদি সব শুনল।
“বাবা দাম দেয়নি, তুই ঠিক দেখেছিস”
“ হ্যাঁ, বাবা ভুল করেছে কোথাও, লোকটার কোনও দোষ নেই। ওরা তো গরীব, মাছের দাম না পেয়ে লোকটা খুব কাঁদছে”
“ তুই ঠিক বলছিস তো, আবার ভাব”
“পিলু মাথা নাড়ল। চল, ঠাকমার কাছে যাই”।
সব শুনে ঠাকমা বাইরে এসে দাঁড়াল। পেন্নাম হই মা।
“ও গণেশ, তুমি ? তোমার মাছ কাটা হয়ে গেছে”
“ হ্যাঁ, মা, এই যে, , আমি ভেতরে দিয়ে আসবো”
“না, না ও বাসু নিয়ে যাবে, তোমার চোখে জল কেন”
“ মা, আমি গরীব মানুষ হলেও মিথ্যা কথা বলে কাউকে ঠগাই না, ওজনেও ঠগাই না, কত বছর ধরে এই ব্যবসা করছি, কেউ বদনাম দিতে পারবে না”
“হ্যাঁ, তাতো তোমাকে বহু বছর ধরে দেখছি। তাহলে কাঁদছ কেন বললে না?
“বাবু বলছে মাছের দাম দিয়েছেন, না মা, বাবু কোথাও ভুল করছেন। বাবু দাম দ্যাননি। আমি আপনাদের বাড়ীতে আজ প্রথম আসছি না, যাক গে, সেসব কথা, চলি মা”।
“মাছের কত দাম”?
“ তিনশ টাকা”
“তুমি দাঁড়াও একটু”। ঠাকমা ভেতরে চলে গেল। দিদিও মাছ নিয়ে চলে গেল। পিলু বসে রইল। কিছুক্ষণ বাদে ঠাকমা তিনশ টাকা ওর হাতে দিল।
“তুমি এবার চোখের জল মোছো, কাল একবার আসবে সকাল সকাল। আমি বড় খোকা ফিরলে সব জেনে নেব”
“নিশ্চয় আসবো মা, ঠিক আসবো, আমি মিছে কথা বলিনি”
মাছওয়ালা মাথায় দুহাত ঠেকিয়ে ঠাকমাকে পেন্নাম করে চলে যায়। দিদি আবার পড়তে বসে গেছে। পাশের চেয়ারে বসে পিলুও হাঁদাভোঁদার কমিকস নিয়ে পড়তে শুরু করল। পড়ছে আর আপন মনে হাসছে। কিছুক্ষণ পড়ার পর, সেই চিন্তাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বাবা কেন বলল টাকাটা দিয়েছে।
“এই পিলু মা-যে ডাকছে শুনতে পাচ্ছিস না, চল সকালের টিফিনটা খেয়ে আসি, মা ডাকছে”। মায়ের কাছে যেতেই এবার মা-ও জিজ্ঞেস করল, “তুই ঠিক দেখেছিস পিলু তোর বাবা মাছওয়ালাকে টাকা দেয়নি”?
পিলু জোরে জোরে মাথা নাড়ল। ওরা চুপচাপ পরোটা আর আলু ভাজা খাওয়াতে মনোযোগ দিল। পিলুর মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, বাবা ফিরলে তো ওকে ছাড়বে না। মনে মনে ভয় পেতে শুরু করল। তাহলে? কিন্তু সত্যিই তো বাবা টাকা দেয়নি। টিফিন খাওয়া শেষ হতেই পিলু বাবার পড়ার ঘরে ঢুকে পড়ল। টেবিলের ওপর নীচ দেখল, ঘরের আনাচে-কানাচে খুঁজতে থাকল, না কোথাও টাকা নেই। আবার দিদির পাশের চেয়ারে বসে সেই কমিকসের পাতা ওল্টাতে থাকল, মন ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই টাকাটা গেল কোথায়? পিলু এবার হাজির শোবার ঘরে, ওখানে একপাশে রয়েছে আলনা, বাবার জামা-প্যান্ট-গেঞ্জি-ধুতি থাকে। মা আর দিদি এগুলি গুছিয়ে রাখে। আলনাতে পিলুর জামাপ্যান্ট গেঞ্জি থাকে। দিদির,মায়েরও রয়েছে। খাটের তলা থেকে শুরু করে দরজার কোণাগুলি তন্নতন্ন করে খুজল পিলু , না, এখানেও কোথাও টাকা খুঁজে পাওয়া গেল না। মন খারাপ করে আবার দিদির পাশের চেয়ার। দিদি খুব মন দিয়ে পড়ছে । পিলু ভাবছে, মাছওয়ালা যখন ভোরে এসেছিল তখন বাবা একটা ফতুয়া পড়ে বাইরে বেড়িয়ে এসেছিল, মাঝে আর একবার ওই ফতুয়া পড়েই বাবা বাইরে এসেছিল, জিজ্ঞেস করেছিল “তোমার মাছ কাটা হয়নি” ?
“এতো তাড়াতাড়ি হয় বাবু, যেরকম মাছ সেরকম সময়- কাতলাটা কাটা হয়ে গেছে। এবার বাটা ধরেছি“
“ঠিক আছে, ঠিক আছে, ভালো করে কেটে ধুয়ে দিয়ে যাবে”।
তার অনেকক্ষণ বাদে বাবা পাঞ্জাবি ধুতি পড়ে এসেছিল। তাহলে তো এমন হতে পারে ওই ফতুয়ার মধ্যে সব রহস্য লুকিয়ে আছে। বাবা স্নান করার পর আর কেউ এখনও স্নান করেনি। পিলু ছাদে গিয়ে দেখে এসেছে, ওখানে বাবার পরণের লুঙ্গি আর গামছা মেলা রয়েছে। ফতুয়াটা তাহলে আলনাতেই আছে। কিন্তু ওতো উঁচুতে পিলুর হাত যাবে না। একটা লাঠি যোগাড় করে পিলু ছুটল শোয়ার ঘরে। লাঠি দিয়েও কিছু করা গেল না। অগত্যা দিদির কাছে। ওর ভাবনাগুলো দিদিকে খুলে বলল। হ্যাঁ, এটাও হতে পারে। চল দেখি। সেই তিনশ টাকা উদ্ধার হল। তারপর বাড়ীতে পিলুর মর্যাদা অনেক বেড়ে গেল। হ্যাঁ, পরের দিন ওই মাছওয়ালা এসেছিল, বাবা খুব দুঃখ প্রকাশ করেছিল। পিলু এখন সকলের কাছে স্বীকৃত গোয়েন্দা।
0 comments:
Post a Comment