সম্পাদকের কলমে

নারায়ণ দেবনাথ- সত্যি বলতে কি একটা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হল। একটা বিশাল বড় অধ্যায়, যেখানে বাবা/ মা, ছেলে/ মেয়ে বা দাদু/দিদা, পিসি, ঠাম্মা সব এক হয়ে গেছিল । চলে গেলেন শরীরের দিক থেকে কিন্তু সারাজীবন রয়ে গেলেন মনে, চোখে আর স্বপ্নে। কার্টুন তাও আবার নিখাদ বাংলা ভাষায়, বাংলা চরিত্র নিয়ে, কিন্তু সেই চরিত্র আবার খুব সাহসী। উনি সাহস দেখিয়েছিলেন বলেই বাংলার ঘরে ঘরে বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা পৌঁছে গেছে। নারায়ণ দেবনাথ -এর প্রতি #গল্পগুচ্ছ এর পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ প্রণাম । ভাল থাকবেন, যেখনেই থাকবেন। আমরা কিন্তু আপনার দেশেই রয়ে গেলাম । নমস্কার সহ অঙ্কুর রায় সংখ্যার সম্পাদক অভিজিৎ চক্রবর্ত্তী প্রধান সম্পাদক

লেখা পাঠানোর জন্য

আপনার লেখা পাঠান আমাদেরকে
golpoguccha2018@gmail.com

Total Pageviews

By Boca Nakstrya and Gologuccha . Powered by Blogger.

ইন্টারনেট 

 

বাঘের মাসি

দেবাশিস দণ্ড



থেবড়ি হঠাৎই জানতে পারল পশুসমাজে তাদের স্থান ঢের উঁচুতে। দেদার মান-ইজ্জত তাদের পাওয়ার কথা। তার বদলে পায় কী? অন্যের দয়া-দাক্ষিণ্য আর এঁটোকাঁটা। ছ্যা ছ্যা, এটা জীবন?

  সেদিন গুবগুব পড়া মুখস্থ করছিল- বিড়াল হইল বাঘের মাসি...বিড়াল হইল বাঘের মাসি। 

  প্রথমবার কথাটা থেবড়ি বুঝতে পারেনি। কেননা সে তখন একমনে হাই তুলছিল। হাই তোলার সময় কথা কানে ঢোকে না। দ্বিতীয়বারে কথাটা শুনল বটে কিন্তু বিশ্বাস হল না। এরপর গুবগুব যখন আবার বলল "বিড়াল হইল বাঘের মাসি" তখন বুঝতে পারল পশুদের সোসাইটিতে তাদের পজিশনটা কোথায়।

  থেবড়ি খুব ছোট থাকতেই এ বাড়িতে এসেছে। ছোট থেকে যে যেই ভাষাটা শোনে, সে সেই ভাষাটা শেখে। থেবড়িও এতদিন থেকে থেকে বাংলাটা শিখে গেছে। শুধু বলতে গেলেই মুশকিল। মাতৃভাষা ম্যাও ম্যাও বেরিয়ে আসে। গুবগুবের মামার বাড়ি মধুপুরে। সেখানে থেবড়ির মা থাকে। সে আবার হিন্দিতে ম্যাও ম্যাও করে।

   এমন সম্মানীয়া একজনের নাম কিনা থেবড়ি। থ্যাবড়া নাক বলে গুবগুব এমন একটা সৃষ্টিছাড়া নাম দিয়েছে। ভাবলেই রাগ হয়। তবে এ বাড়িতে থেবড়ি খুব খারাপ আছে তা নয়। এঁটোকাঁটা দুবেলা দিব্যি জুটে যায়। গুবগুবের বাবা একটু বদরাগী টাইপের। তিনি পাত ছেড়ে ওঠার আগে থেবড়ি যদি ভুল করে একবারটি ম্যাও (অর্থাৎ দাও) বলে, এক থাপ্পড়ে মুন্ডুটা মধুপুরে পাঠিয়ে দেয়।

  বাঘ হল জাতীয় পশু। গুবগুবের বইতে পরিস্কার লেখা আছে। জাতীয় পশুর মাসিকে থাপ্পড় মারা? সহ্য হয়? পড়ে পড়ে মার খাওয়ার দিন শেষ।

  মার্জারসমাজকে জাগাতে হবে। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে বিড়ালের স্থান কত উঁচুতে। কত সমাদর পাওয়ার যোগ্য তারা।

   থেবড়ির হাই তোলা, গুটলি পাকানো, ঘুম-- সব ছুটে গেল। মহল্লার সব বিড়ালদের ডেকে ডেকে বলতে লাগল- "ওঠো, জাগো, নিজেকে চেনো। বিড়ালের মতো বাঁচতে শেখো।" 

  কে শোনে কার কথা। পাড়ার সব বিড়ালের বাড়ি ধরা আছে। যে যার ধরা-বাড়িতে কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে রইল। থেবড়ি  রাগে গরগর করতে লাগল। তোমাদের সম্মানের চেয়ে সুখ বড় হল? ছি! বেশ বেশ, আমি একাই চলে যাব বোনপোর কাছে।

  টারুদের বাড়ির হুলোটার নাম ঢ্যাপোস। সে বলল- বাঘের মাসি আছে বটে, মেসোমশাই তো নেই। তা না হলে আমি চলেই যেতাম তোমার সঙ্গে। তার চেয়ে বলি কি, কেউ যখন যেতে চাইছে না তুমিও যেও না। বেশ তো আছ এখানে।

   থেবড়ি ঢ্যাপোসের কথায় আরও রেগে গেল। বলল- বেশ, তোমরা মানুষের এঁটোকাঁটা খেয়েই দিন কাটাও। আমি একাই যাব বোনপোর কাছে। বাঁচতে হলে সসম্মানে বাঁচব।

  থেবড়ি ফুলো ফুলো লেজটা নেড়ে টা-টা করে চলে গেল। গেল তো গেলই। দিন যায়। মাসের পর মাস যায়। থেবড়ির পাত্তা নেই। 

  কুঁড়ের ঢেঁকি বিড়ালগুলো বলাবলি করল- কী ব্যাপার বল দিকি, আমাদের থেবড়ি কি সত্যিই কেউকেটা হয়ে গেল?

   হলুদ ছোপ ছোপ বিড়ালটা বলল- আমরা কি তবে বঞ্চিত হলাম?

   ছাই ছাই বিড়ালটা বলল- এখন আর ওসব বলে কী হবে? তখন তো ওর কথা কেউ শুনলাম না।

  ঢ্যাপোস বলল- অত কথা কীসের? কী হল না হল একবার খোঁজ করে দেখে আসলেই হয়। অত ভেঙে পড়ার কোনও কারণ নেই। মনে রাখবে, মা একটা হলেও মাসি কিন্তু গাদা গাদা হয়। আইন যখন আছে সবাই মাসির মর্যাদা পাবে। এখন আমাকে যেভাবেই হোক থেবড়ির কাছে পৌঁছাতে হবে।

  হলুদ ছোপ ছোপ বলল- থেবড়ি কি আর সেই থেবড়ি আছে? ওর কাছে পৌঁছানো কি অতই সোজা? বাঘের মাসি বলে কথা। তার ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা।

  তবুও ঢ্যাপোস বেরিয়ে পড়ল থেবড়ির খোঁজে। পশ্চিমে কয়েক ক্রোশ দূরে গভীর জঙ্গল। থেবড়ির বোনপো নিশ্চয় সেখানেই থাকে। টপাং টপাং করে এক হাজারটা পাঁচিল টপকে, এ গলি সে গলি পেরিয়ে, নালা-নর্দমা ডিঙিয়ে অবশেষে ঢ্যাপোস পৌঁছে গেল সেই জঙ্গলে। না, কোথাও হালুম হুলুম নেই। তবে কি বোনপো এ জঙ্গলে থাকে না?

   জঙ্গলটা ক্রমশ গভীর হচ্ছে। কতরকম গাছ। গাছগুলো জড়াজড়ি করে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এ গাছের ফুল ও গাছে ফুটেছে, এ গাছের ফল ও গাছে পেকেছে। গাছে গাছে কি ভাব! জঙ্গলটা অসম্ভব শান্ত। কোথাও হট্টগোল নেই। পাখিরা শিস দিচ্ছে, সেটাও মিলেমিশে। হঠাৎ একটা বুড়ো শেয়ালের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। পন্ডিত পন্ডিত ভাব। ঢ্যাপোস বলল- এদিক পানে কোনও বিড়াল দেখেছেন? এই ধরুন আমার মতোই গায়ের রং।

  শেয়াল গম্ভীর হয়ে বলল- হুম, তো তোমার কী দরকার হে ছোকরা? খেদিয়ে বিদেয় করেছ, আবার খোঁজ নিতে এয়েছ?

  : কী যে বলেন, সে তো নিজেই চলে এসেছে। আচ্ছা, কোথায় দেখেছেন বলতে পারেন?

   বুড়ো শেয়ালটা উঁচু উঁচু গাছের ফাঁকে নজর চালিয়ে সুয্যিটাকে দেখে নিল। তারপর বলল- এখনও বেলা পড়েনি হে, ঝটপট গেলে দেখা হয়ে যাবে। বেশি দেরি কোরো না বাপু, তাহলে তিনি আবার এসে পড়বেন। তিনি এসে পড়লে কী হবে বলা খুব মুশকিল।

  : তিনি কে? বাঘ?

  : ঠিক ধরেছ। কী করে বুঝলে হে ছোকরা?

  : থেবড়ি নিজেই তো বলছিল। থেবড়ি মানে যার খোঁজে এসেছি। সে নাকি সম্পর্কে তার মাসি হয়। 

  : মাসি? হা হা হা, তা বটে তা বটে। যাও যাও, ঝটপট যাও। গুনে গুনে একশ পা গেলেই ডানদিকে গুহাটা পাবে। সাবধানে যেও হে ছোকরা।

   শেয়াল দুলকি চালে চলে গেল। ঢ্যাপোস একশ পায়ের রাস্তা দশ পায়ে মেরে দিল। গুহার দুয়ারেই দেখতে পেল থেবড়িকে। সে তখন উল্টোমুখো হয়ে ফুলো ফুলো লেজ দিয়ে দুয়ার ঝাঁট দিচ্ছিল। উল্টোমুখো ছিল বলে প্রথমে দেখতেই পায়নি। ঢ্যাপোস বলল- কী খবর থেবড়ি?

   পরাং করে ঘুরতেই থেবড়ি একেবারে ঢ্যাপোসের মুখোমুখি। এ কী চেহারা হয়েছে থেবড়ির? বসা চোখ, ভাঙ্গা চোয়াল, নেতানো গোঁফ। ঢ্যাপোস একগাল হেসে বলল- বাঘের মাসি কেমন আছে দেখতে এলাম।

  : আর বাঘের মাসি...

  : কেন কী হয়েছে?

  : বাঘের মাসি হয়ে বাঘের গুহায় এলাম, বাঘ আমাকে কাজের মাসি করে ছেড়ে দিয়েছে।

0 comments: