সম্পাদকের কলমে

নারায়ণ দেবনাথ- সত্যি বলতে কি একটা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হল। একটা বিশাল বড় অধ্যায়, যেখানে বাবা/ মা, ছেলে/ মেয়ে বা দাদু/দিদা, পিসি, ঠাম্মা সব এক হয়ে গেছিল । চলে গেলেন শরীরের দিক থেকে কিন্তু সারাজীবন রয়ে গেলেন মনে, চোখে আর স্বপ্নে। কার্টুন তাও আবার নিখাদ বাংলা ভাষায়, বাংলা চরিত্র নিয়ে, কিন্তু সেই চরিত্র আবার খুব সাহসী। উনি সাহস দেখিয়েছিলেন বলেই বাংলার ঘরে ঘরে বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা পৌঁছে গেছে। নারায়ণ দেবনাথ -এর প্রতি #গল্পগুচ্ছ এর পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ প্রণাম । ভাল থাকবেন, যেখনেই থাকবেন। আমরা কিন্তু আপনার দেশেই রয়ে গেলাম । নমস্কার সহ অঙ্কুর রায় সংখ্যার সম্পাদক অভিজিৎ চক্রবর্ত্তী প্রধান সম্পাদক

লেখা পাঠানোর জন্য

আপনার লেখা পাঠান আমাদেরকে
golpoguccha2018@gmail.com

Total Pageviews

By Boca Nakstrya and Gologuccha . Powered by Blogger.

 অকস্মাৎ

প্রতীষা চট্টোপাধ্যায়

                 

আলতো আদর করে চোখের পাতা খুললো মনীষা।শীটটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে মিষ্টি অনুভূতিটা তারিয়ে নিতে লাগলো।

আজই সেই দিন!

‘তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কি আমাকে মিট্ করতেই হবে?’

‘ফুলিশ্!দেখা না করলে বিয়ে হবে কি করে?’

'তবু…যদি এই ফর্ম্যালি দেখা করাটা….’

বোকা ছেলেটা আজকের দিনটার জন্য নার্ভাস ফিল করছিলো।

মিউজিক্যাল ক্লকটা বকতে শুরু করতেই লাফিয়ে উঠলো মনীষা।

‘মা!ডাইনিং-এ এই পর্দা কেন?সিফনেরটা কোথায় গেলো?’

গেটের দু’ধারে অর্কোরিয়ার টব রাখা হয়েছে কিনা দেখে নিতে হবে।

‘বিশ্বম্ভরকাকা,টবগুলো রাখার সময় তাকাওনি?শুকনো পাতাগুলো ছাঁটা হয়নি কেন?’

কুইক্ রেডি হয়ে নিতে হবে।ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েই মনীষার হাঁকের পর হাঁক।

ফলস্বরূপ মনীষার মা উদিত হলেন বটে,তবে যেন মনীষার ডাকে যত তাড়া ছিল ততটাও তাড়াতাড়ি নয়।

‘কি মা, আজ রাহুল আসছে,ঘরদোর এখনো অগোছালো?’

‘সবে তো আটটা মনি,সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘ওহ্-হো!’,বিরক্তি মনীষার গলায়।‘তুমি কোন্ শাড়িটা পরবে বাছা হয়েছে?’

উত্তরের অপেক্ষা না করেই ওর একরাশ কথা বেরিয়ে আসে--‘আমি আজ নীল সিল্ক…না নীলটা নয়,পিঙ্ক্ই রাহুল পছন্দ করে।বাপি কোথায়?শেভ্ করেছে?’

মনীষার মা এসে বিছানায় বসলেন।ও বুঝতে পারে,মা ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন।নেল এনামেল লাগাতে লাগাতে ওর আড়চোখ মায়ের হাসি দেখতে ভুল করলোনা।‘কি বিরক্তিকর!এভাবে দেখছে কেন?মা বলেছিলো কাটলেট্ বানাবে; প্লেন না বানিয়ে কবিরাজি বানালে আমাদের স্ট্যাটাসটা হাই-ফাই দেখাতো’।‘নীচে নমিতার ছেলেটা আজ যেন বড্ড বেশি ঘ্যান্-ঘ্যান্ করছে না?’,মনীষা তার টেনশনের আঁচটা মায়ের দিকে ছুঁড়ে দিলো,‘ঐ ইরিটেটিং বাচ্চাটাকে আজ তো না আনলেই পারতো; কি রকম হ্যাংলা চোখে তাকিয়ে থাকে নতুন লোক দেখলে!’

মা হঠাৎ নরম স্বরে বলে উঠলেন,‘কি হয়েছে?সব তো ঠিক করাই আছে, তবে কিসের এতো টেনশন?’

‘না না, টেনশন কোথায়?’

মা চলে যেতে মনীষা বারান্দায় চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলো।ন’টা বত্রিশ।আর বেশি দেরি নেই।ও কি বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে?--ডুব দিলো নিজের মনের গভীরে।একটু যেন এক্সাইটেড্ হয়ে পড়ছে সে।প্রথমবার রাহুল আসছে ওদের বাড়ি!রাহুলদের স্ট্যাটাস মনীষাদের চেয়ে অনেক ওপরে।ওর বাবা তো মার্চেন্ট্ নেভিতে বড়ো পোস্টে ছিলেন।ওকে নিজের করে পাওয়া তো মনীষার জীবনে লটারী লাগার মতো—দ্য বেস্ট্ চয়েস।রেড রোড ধরে হাঁটার দিন বিদেশিনী মহিলা দু’জন রাহুলকে ‘হাই হ্যান্ডসাম!’ বলে সম্ভাষণ করায় মনীষার কি ঈর্ষা!পাশাপাশি হাঁটলেও রাহুল ওর চেয়ে বেশি সুন্দর।

মনে পড়লো কলেজে রাহুলকে বলা হতো “কমনরুম কিং”।সে কোন ব্র্যান্ডের শার্ট পরেছে,ওর গাড়ি করে কলেজে আসা--সব ছিলো কমনরুমের হটকেক।একদিন তো মহিলামহলের আলোচনায় ঢুকে পড়ে শুনলো এন সি ম্যাডামেরও নাকি হার্টথ্রব থার্ড ইয়ারের রাহুল সান্যাল!কলেজে ক্লাস তখন সবে সবেই চালু হয়েছে;সে দিনটার কথা মনে পড়লে শিহরন হয়!ইউনিয়নের অবস্থানবিক্ষোভ চলছে, ক্লাস তাই বন্ধ।মনীষা দাঁড়িয়ে আছে গেটের উল্টোদিকের“মৌচাকে”।হট্টগোলের মাঝে রাহুলদার গাড়ি এসে থামলো।সব্বাই বাইরে দাঁড়িয়ে, কিন্তু সেই রাহুলদা বি ডি ম্যাডামের সাথে কথা বলতে বলতে ভিতরে ঢুকে গেলো।

‘দিদিমনি,মা এটা তোমায় দিতে বললো।’,ছিন্ন হলো চিন্তা।

‘ও হ্যাঁ।’

ফুলগুলো নিয়ে দ্রুত তৎপর হয়ে উঠলো মনীষা ঠিক সেই জায়গায় রাখার জন্য, যেখানে রাখলে ঘরটাকে সবচেয়ে সুন্দর দেখায়।

সোয়া দশটা।‘ধুর্!ল্যান্ডফোনটাও খারাপ আজ ক’দিন ধরে!মোবাইলটাও এমন বাথরুমে পড়ে গেলো পরশুর আগের দিন…’।মনীষা স্নানে ঢুকেছে ,আর তখনি রাহুলের ফোন; মা ওকে ডেকে ফোনটা বাড়িয়ে দিলেন--যেই ও ধরতে যাবে ওমনি ফোনটা গেলো পড়ে; সেই রোববার রাহুলের সাথে শেষবার কথা হয়েছে…’, অধীর হলো মনীষা।  

বাইরে একটা চেঁচামেচি শোনা গেলো।বিশ্বম্ভরকাকার একটা খচর্-মচর্ চেহারার লোকের সাথে তর্ক চলছে।

‘ম্যাগ্গোঃ!যত্ত সব ভিকিরি!আজকেই আসতে হলো?’

‘কি হলো বিশ্বম্ভরকাকা?ভাগাও জলদি।’

‘রাহুল যদি দেখে আমাদের বাড়ির চাকর কথা বলছে এ রকম একটা নোংরা লোকের সাথে,কি ধারণা হবে আমাদের ফ্যামিলি সম্পর্কে?’,চিন্তিত হলো মনীষা।গেটের থাম আর বিশ্বম্ভরকাকার আড়ালে থাকায় লোকটাকে ভাল করে দেখাও যাচ্ছে না।একটা অগোছালো চেহারা, তার ওপর কাছা পরা!--‘ডিজ়গাস্টিং!সাহায্যের আশায় যে সে যখন তখন হাজির যায়!’ তার সুন্দর চিন্তার মাঝে হঠাৎ ঢুকে পড়া এই অশুভ ছায়াকে সে দ্রুত দূর করতে চাইলো।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনীষা দেখে নিতে চাইলো তার দিনের বেলার উপযুক্ত হালকা মেকাপ ঠিক আছে কিনা;আইলাইনারটা কি আর একটু ডীপ করবে?আইলাইনারের “ধরা-না-যায়” ছোঁয়া দিতে লাগলো চোখে।‘যে কোন মুহূর্তে এসে পড়বে রাহুল। আজ কি পরে আসবে?কেমন দেখাবে ওকে?’ আজই যেন মনীষার “বিয়ে ফাইনালের” রেজ়াল্ট্!তারপর?নাঃ,ভবিষ্যতের ছবি বড়ো অস্পষ্ট!

‘দিদিমনি,লোকটা আপনার নাম বলছে।’

‘ক্কিঃ!’

মনীষা গেটের দিকে এগোতেই অশুভ ছায়াটা তার দিকে এগিয়ে এলো।তার চোখ মনীষার দিকে স্থির। পা থেকে ক্রমশঃ অবশ ভাব ছড়িয়ে যাচ্ছে মনীষার সারা শরীরে—‘র্-রাহুল!!’

‘পারবোনা আমি তোমায় বিয়ে করতে….’ হুড়মুড় করে কেঁদে ফেলে মানুষটা।

‘আমার মা… … তোমার জন্যই….’

‘কি বলছো এসব?’

নৈঃশব্দ গ্রাস করে ওদের দু’জনকে।

কয়েকটা অসহ্য মুহূর্ত পার হলে রাহুল বলে ওঠে—এবার গলায় দৃঢ়তা নিয়ে,--   

‘আমার মা কাল…গয়নার দোকানের সামনে…বাসটা এতো রেকলেস্…মা যদি না যেতো, তাহলে আর….’

0 comments: