সম্পাদকের কলমে

নারায়ণ দেবনাথ- সত্যি বলতে কি একটা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হল। একটা বিশাল বড় অধ্যায়, যেখানে বাবা/ মা, ছেলে/ মেয়ে বা দাদু/দিদা, পিসি, ঠাম্মা সব এক হয়ে গেছিল । চলে গেলেন শরীরের দিক থেকে কিন্তু সারাজীবন রয়ে গেলেন মনে, চোখে আর স্বপ্নে। কার্টুন তাও আবার নিখাদ বাংলা ভাষায়, বাংলা চরিত্র নিয়ে, কিন্তু সেই চরিত্র আবার খুব সাহসী। উনি সাহস দেখিয়েছিলেন বলেই বাংলার ঘরে ঘরে বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা পৌঁছে গেছে। নারায়ণ দেবনাথ -এর প্রতি #গল্পগুচ্ছ এর পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ প্রণাম । ভাল থাকবেন, যেখনেই থাকবেন। আমরা কিন্তু আপনার দেশেই রয়ে গেলাম । নমস্কার সহ অঙ্কুর রায় সংখ্যার সম্পাদক অভিজিৎ চক্রবর্ত্তী প্রধান সম্পাদক

লেখা পাঠানোর জন্য

আপনার লেখা পাঠান আমাদেরকে
golpoguccha2018@gmail.com

Total Pageviews

By Boca Nakstrya and Gologuccha . Powered by Blogger.

 কে পাস আটকায় দেখি

                             কৃপাণ মৈত্র


ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। সব ছাত্ররা হল্লা করে বাড়ি ফিরছে। বসন্তর মনে সুখ নেই।সে মুখ চুন করে বাড়ি ফিরছে। অবশ্য এমন নয় যে এই অভিজ্ঞতা  তার প্রথম ।সে খুব খেটে পড়েছিল তবুও পাস হলো না। বসন্ত বুঝতে পারে না এত লেখা সত্ত্বেও সে পাশ করে না কেন। গত পরীক্ষায় খাতায় লাল দাগের বাগান দেখে সে অবাক হয়ে স্যারকে জিজ্ঞাসা করেছিল কেন সে নম্বর পাইনি। স্যার তাকে কাছে ডেকে একটা আস্ত ছড়ির পরমায়ু শেষ করে  তার আবিষ্কারের আদম ইভ এর জীবন চরিত পড়তে শুরু করলেন। বাকি ছেলেরা তো হেসে খুন ।বসন্ত সারা শরীরে নবীন বাঁশের অত্যধিক আদরে এমন জর্জরিত ছিল যে স‍্যারের পাঠ বা সহপাঠীদের ঠাট্টা রসিকতা তার কানে ঢুকছিল না ।
     রাস্তা বাঁঁক নিয়ে তাদের বাড়ির দিকে ঢুকেছে।জমির সিঁথি চিরে সরু রাস্তা। বর্ষায় ডুবে যায় ।অন্য উপায় নেই বলে ওই রাস্তা ধরেই  লোকেরা যাওয়া-আসা করে।বসন্ত অতিরিক্ত পোশাক বয়ে নিয়ে যায়।পড়াশোনায় নজর কাড়তে না পারলে ও ঝড়-বৃষ্টি বাদলা যেমনি আবহাওয়া হোক না কেন বসন্ত স্কুলে হাজির হয়ে স‍্যারদের নজর কাড়ে ।কোনো কারণে যদি সে অনুপস্থিত হয় তাহলে স‍্যার এবং সহপাঠীদের কৌতূহলের শেষ থাকে না ।পরেরদিন হাজারো প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে অনুপস্থিতির কারণ সবিস্তারে ব্যাখ্যা করতে হয়।
      বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন মূর্তিমান অশেষদাদু।অশেষদাদুর নাকি অনেক বয়স । কিন্তু দেখে বোঝা যায় না।সোজা হয়ে চলেন। খালি চোখে আধ মাইল দূরের জমির ফসল কেমন বলে দিতে পারেন। এই কনকনে শীতেও পরনে আটহাতি ধুতিএবং ফতুয়া। দাঁত বের করে বললেন ,"এবারও ও পাস করতে পারলি না।বলেছিলাম পাস করতে পারবি না।লাগলো কিনা।আমার কথা কখনো মিথ্যা হয় না। বামুন ঘরে গাধা কোথাকার।"
    বসন্ত পালাবার উদ্যোগ করলে অশেষদাদু তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলেন ,"পালালে হয় নারে। পাস হলে না হয় এগোতিস কিন্তু ফেল তো তোর পিছু পিছু ছুটবে ।না কী। এক কাজ কর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে মাঠে মাঠে গরু চরা। কি আনন্দ বল দিকিনি!বাঁশি বাজাবি,গরু চরাবি,গোবর কুড়াবি...আর কী চাই।" 
    বসন্ত একটু আলগা পেতে ছুটতে শুরু করল। অশেষ দাদু চিৎকার করে বললেন, "আমার কথাটা ভেবে দেখিস কিন্তু।"
    পরের দিন সকালে বসন্ত মুড়িতে নলেনগুড় মাখিয়ে মৌতাত করে রোদলাগা উঠনে খাবে  বলে সদর দরজা খুলে দেখে অশেষদাদু দাঁড়িয়ে আছেন।মুখে স্মাইল প্লিজ হাসি। তিনি বললেন, "কী রে তাহলে ঐ কথাই রইল ।"
   বসন্ত বাটি ফেলে দিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। দুপুরবেলা বসন্ত বন্ধুদের সঙ্গে ডাংগুলি খেলছিল ।বোধন এ্যয়সা জোরে মারল  যে কড়েটা গিয়ে পড়ল পঞ্চাশ হাত দূরের ঝোপের মধ্যে।
  বোধন বসন্তের সঙ্গে একই ক্লসে পড়ে।ফাইভের গেরোয় তিন বছর ।আইনের আলগা ফাঁসের দৌলতে ছয় ছোঁয়ায় সৌভাগ্য হয়েছে তার।পড়াশোনায় বসন্তর থেকে খারাপ।বসন্তর ঠাকুমার ধারণা ঐ রকম বকাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশে বসন্ত খারাপ হয়ে গেছে ।বসন্তকে ওর ঠাকুমা কতবার নিষেধ করেছেন কিন্তু বসন্ত শোনে নি ।কতবার আঘাত নিয়েও বাড়ি ফিরেছে ।বাবা প্রহার করেছেন ।বসন্ত মনে মনে পণ করেছে, আর যাবে না।কিন্তু যেই ছায়া পশ্চিমে বড় হতে শুরু করে রায়বাবুদের তিনবিঘল খামার ওকে নিশিডাকের মতো আকর্ষণ করে।সেখানে যেন খেলার কন্ঠিমালা।দলে দলে খেলা হয়।
   বসন্ত ঝোপের মধ্যে ঢুকে দেখে অশেষদাদু ঝোপের আড়ালে বসে আছেন। বসন্ত থমকে দাঁড়িয়ে গেল। পালাবার কথাটাও ভুলে গেল ।
    অশেষদাদু দাঁত বের করে বললেন, "তাহলে ওই কথাই রইল। আমার দশটা গরু আছে ।গোবর আধাআধি।"
    বসন্ত চোঁঁ চোঁঁ করে ছুট দিল ।বন্ধুরা হাঁক পাড়ল, "কি রে কী হল! অমন পালাচ্ছিস কেন ?ভূত দেখলি  না কী?"
     পৌষখোলানে খামারে ল‍্যাবা টানার ধূম পড়েছে। মা বললেন, "বসন্ত, যা না বাবা, গোবরের বালতিটা  নিয়ে। ন‍্যাতা দিবি পলদন্ড থেকে সোজা গাদা পর্যন্ত।তারপর গাদা থেকে মোরাই পর্যন্ত।পারবি না।তারপর চালপিটুলির আলপনা।একটু শুকনো হলে আমি দিয়াসবখন।"
  বসন্ত উৎসাহের সঙ্গে বলে, "পারব না কেন।খুব পারব।"
    বসন্ত সবে গোবরের বালতিটা মাথায় নিয়ে খামারে এসেছে এমন সময় গাদার আড়াল থেকে অশেষদাদু বেরিয়ে এসে  দাঁত বের করে বললেন ,"কী রে মনে আছে তো।"
     হতবুদ্ধি হয়ে বসন্ত পুরো বালতির পুণ্য নিজের মাথায় ঢেলে ছুটে ঘরে ঢুকে পড়ল। 
    অশেষদাদু খ‍্যাক খ‍্যাক করে হাসতে হাসতে বললেন, "বামুন ঘরের বলদ কোথাকার।"তারপর চলে গেলেন ।
   বসন্তের মনে সুখ নেই। সবসময় মন মরা হয়ে সে ঘুরে বেড়ায়।একদিন পুকুর ঘাটে বসে সে একটা একটা করে ঢিল ছুঁঁড়ছিল পুকুরে। ঢেউগুলো  বুক ফুলিয়ে পাড় ছুঁয়ে স্বস্তি পাচ্ছিল। তার বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ।মধুপকাকু ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মধুপকাকু কলকাতার একটা কারখানায় কাজ করেন। জ্ঞাতি সম্পর্কে তিনি বসন্তর বাবার ভাই ।তিনি দাঁড়ালেন বসন্তের পেছনে। বসন্তের খেয়াল নেই ।মধুপকাকু তার পিঠে হাত রাখলেন।বসন্ত চমকে উঠল।
    মধুপকাকু বললেন,"বসতে হলে ছিপ নিয়ে বস।"
বসন্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
  "কী রে এত মনমরা কেন ? "   
    বসন্ত কোন কথা না লুকিয়ে সব কথা মধুপ কাকুকে বলল।মধুপকাকু হাসতে হাসতে বললেন ,"ও এই কথা ।তবে কী জানিস তোর মনে যখন দাগ কেটেছে, তখন খাতায় দাগ কাটা অসম্ভব নয়। কিন্তু তার আগে তোকে রাহুমুক্ত হতে হবে ।এক কাজ কর দিকিনি। অশেষদাদুকে দেখলে একটা কথা বলতে পারবি।"
     বসন্ত হ্যাঁ বা না বলার আগে মধুপকাকু তার কানটা মুখের কাছে এনে এক মহা মন্ত্র দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলেন।
     অশেষদাদু সেই পাখিজাগা ভোরে ওঠেন ।সারা পাড়ায় ঘুরে বেড়ান। কার-বাগানের ফসলে কেমন মড়ক লেগেছে জানান।প্রতিবিধানের উপায়ও বাতলে দেন ।রাতের ঝড়ঝাপটায় রাস্তার উপর পড়া ভাঙা ডালপালা পরিষ্কার করে রাস্তা সুগম করে দেন।বসন্ত রাতের মোড়কখোলা ভোরে অশেষদাদুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রইল ।অশেষদাদু দরজা খুলে বসন্তকে দেখে চমকে উঠে সবে বলতে যাবেন 'তাহলে তোর বোধোদয় হয়েছে' কিন্তু তার আগেই বসন্ত মরা কান্না শুরু করে দিল। অশেষ দাদু অবাক হয়ে বললেন, "কী রে ,কী হল তোর!"
    বসন্ত বলে ,"আমি ভোর বেলার স্বপ্নে দেখলাম তুমি মারা গেছে ।সকালের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয় ।"
    অশেষদাদুর মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
    সারাদিন অশেষদাদুর দেখা পাওয়া গেল না। 
    পরের দিন বিকেলবেলা বসন্ত অশেষদাদুর দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলে অশেষদাদু বেরতে বসন্ত ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে কাঁদতে  বলে, "এই নাও কামরাঙ্গা । গাছের।খাও।শেষ খাওয়া। দুপুর বেলার স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। আমি দেখলাম শ্মশানযাত্রীরা তোমাকে নিয়ে শ্মশানে যাচ্ছে ।ঘুমটা ভেঙে গেল।হ‍্যাঁ গো দাদু সত্যি সত্যি ,সত্যি হয়?"
   অশেষদাদু দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।
     বসন্ত পর পর তিন দিন অশেষদাদুর দরজায় টোকা দিয়েছে কিন্তু অশেষদাদু দরজা খোলেন নি।ডাকাডাকি করেও সাড়া পায়নি সে।বসন্তর অশেষদাদুর জন্য খুব দুঃখ হল। সে মনমরা হয়ে বাড়ি ফিরে এলো।মধুপকাকুর পরামর্শে এমন করাটা উচিত হয়নি।
     কয়কদিন পর মাঠচেরা রাস্তা দিয়ে বসন্ত  চলেছে স্কুলে। দেখে অশেষদাদু আসছেন। কেমন যেন বিধ্বস্ত চেহারা।বেশ কিছুটা কাছাকাছি আসার পর প্রায় একশ হাত ফারাকে অশেষদাদুর চোখ গেল বসন্তের দিকে।অশেষদাদু দু'কানে আঙ্গুল দিয়ে উল্টো পায়ে দ্রুত ছুটতে লাগলেন ।বসন্ত ও ছাড়বার পাত্র নয়।বসন্ত ও ছুটতে লাগল।অশেষদাদু হোঁচট খেয়ে রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে পড়লেন মাঠে। বসন্ত ছুটে গিয়ে দেখে অশেষ দাদুর চেতনা নেই।কপালে চোট লেগে   রক্ত বেরোচ্ছে। বসন্ত স্কুল ব্যাগ থেকে  জলের বোতল বের করে  অশেষ  দাদুর চোখেমুখে দিতে তিনি চোখ খুললেন । চোখ খুলে বসন্তকে দেখে  ইঁ ইঁ শব্দ করে কানে আঙুল দিয়ে চোখ বুঝলেন।বসন্তের চোখে জল এসে গেল। সে জোর করে অশেষদাদুর কান থেকে হাত সরিয়ে বলল ,"আজ ভোরে স্বপ্ন দেখলাম সে তুমি নয় ।সে তো বিপিন দাদু । ওই যে গো  গতবছর যে কলেরায় মারা গেল।মাঝিপাড়ার।
    অশেষদাদু তড়াক করে উঠে বসে হাসতে হাসতে বললেন  ,"তাই বল ।আমার তো এখন মৃত‍্যুযোগ নেই।হ‍্যাঁ,এবার কিন্তু কোন সন্দেহ নেই  ।তুই পাস।  দে দিকিনি তোর জলের বোতলটা । তেষ্টায় একেবারে গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।বাপরে বাপ দারুণ ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলি।"
      "তোমার কপালে তো রক্ত।দাঁড়াও মুছিয়ে দিই।"
      "ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।তুই ইস্কুলে যা।এবার তোর পাস কে আটকায় দেখি।"
     বসন্তর মনটা খুব হালকা লাগছে।সে স্কুলের পথে রওনা দিল।

1 comments:

ANKUR ROY said...

অসাধারণ গল্প। এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম।