সম্পাদকের কলমে
লেখা পাঠানোর জন্য
Total Pageviews
পেন ড্রাইভ
শিশির পাল
ঠিক সাড়ে বারোটায় মিটিং শুরু হবে। বিগ ক্লায়েন্ট। অন্তত কয়েক কোটি টাকার এক্সপেক্টেড সেলস টার্গেট করেছে কোম্পানি। প্রণয়ের কাছে এই অর্ডারটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। ঘেমে উঠেছে প্রণয়। কিওর ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ইস্টার্ন জোনের মার্কেটিং হেড ও । টেবিল থেকে ল্যাপটপটাকে ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।এত কষ্ট করে বানানো পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন কিছুতেই ওপেন হচ্ছে না। কাল রাত অব্দি কোনও সমস্যা ছিল না। স্ক্রিনে কোনওভাবেই স্লাইডগুলো দেখা যাচ্ছে না। রাগটা তাই ল্যাপটপের উপরেই পড়ছে। ও খুব অস্থির। এত ভালো একটা পিপিটি ফের বানানো খুবই কষ্টকর। ভ্যাকসিনের সম্পূর্ণ ডিটেইলস আছে। কেন এটা মার্কেটে সেরা তা ডেটা, হিস্ট্রি, সার্ভে রিপোর্ট সবকিছু দিয়েই বলা আছে। কোম্পানির প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি, পাস্ট পারফরম্যান্স সব আছে। ফাইলটা যেভাবেই হোক রেডি করতেই হবে।আজ ফাইনাল নেগোসিয়েশন।
কী যে হবে ! ইতস্তত এবং বিহ্বল হয়ে আবার রিস্টার্ট করে ল্যাপটপটা । নাহ। কোনও ভাবেই ফাইলটা খুলছে না। ব্যাক আপ পেনড্রাইভটা যে কী কুক্ষনে হারালো ! ল্যাপটপের বাগেই ছিল অথচ এই কাজের সময় কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছে না। বেশিরভাগ সময় প্রণয় নিজেরই দুটো ইমেলের মধ্যে মেইল এক্সচেঞ্জ করে ব্যাকআপ রেখে নেয়। সেটাও করা হয়নি ।এত বড় ভুল ! নিজেকে ক্ষমার অযোগ্য লাগে। অর্ডারটা পেতেই হবে। এ বছর প্রণয়ের প্রমোশন আছে।
টেবিলে রাখা মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। ঝিল্লি কলিং। ফোন স্পিকারে দেয়। দ্রুত বলে, “বলো। আমিই ফোন করতাম তোমাকে”।
“ও মা।তাই। আমি জানি তো তুমি ভুলবে না। নিয়ে নিয়েছ ওটা ? ঠিক আছে। আমি সেজন্যই কল করেছিলাম”।
প্রণয়ের মাথায় কিছু ঢুকল না। বলল, “কোনটা” !
“এর মধ্যেই ভুলে গেলে ! তুমিই তো বলেছিলে, ওটা নিয়েই ফোন করবে। অফিসে ঢোকার আগেই”।
“ওহ।তাই” ?
“হ্যাঁ। আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও তোমার ফোন না পেয়েই ফোন করছি”।
প্রণয়ের সমস্ত মনোযোগ ল্যাপটপে। কী বোর্ডে আঙ্গুল। মাথায় ঘুরছে, কিভাবে ওই পিপিটি ফাইলটা উদ্ধার বা রিকন্সট্রাক্ট করা যায়। অফিসের টেকনিশিয়ান কোনও হেল্প করতে পারেনি। টিমমেটরাও পারল না।সব সম্ভাব্য রাস্তা বন্ধ।
ঝিল্লি বলে, “ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো আজ। অফিস থেকে ফেরার সময় নিয়ে নিও। মিটিং শেষে একবার কল করো।”
প্রণয়, অজান্তে হ্যাঁ বলে। ঝিল্লি রেখে দেয়।
ঝিল্লি জানে, আজ মিটিং আছে। তাই বেশি কথা বলে না। ও বোঝে গুরুত্বটা।
প্রণয় চেষ্টা করে, ঝিল্লি ঠিক কোন জিনিসটার কথা বলছে।মনে করতে পারছে না। থাক এখন। পরে দেখা যাবে। কিন্তু ঝিল্লিকে তো আসল কথাটা বলাই হলো না । আবার রিং করে প্রণয়। ঝিল্লিকে বলে ঘটনাটা। ঝিল্লি মাথা ঠান্ডা রাখতে বলে। প্রণয় আশাহত।চেয়ারে গা এলিয়ে রাখে। বিবর্ণ ওর চোখ মুখ।রুমের টেম্পারেচার বাইশ ডিগ্রী ফিক্সড করা আছে। তবুও ভেতরে ভেতরে ঘামছে প্রণয়।
“স্যার”।
একটা চেনা কন্ঠস্বর।তাকিয়ে দেখে,চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিনয়। প্রণয় একটু খুশি হয়।এই মোক্ষম সময়ে চা নিয়ে আসার জন্য।অবশ্য বিনয়কে স্ট্যান্ডিং ইন্সট্রাকশন দেওয়াই আছে।সাড়ে দশটায় চা।প্রণয় এলানো শরীরটা তোলে।বলে, “বিনয়, থ্যাংক ইউ।দাও”।
বিনয় চায়ের কাপটা এগিয়ে দেয়। সচরাচর, থ্যাংক ইউ বলে না বিনয়কে। কথাটা রিফ্লেক্সে বলল।মন থেকেই হয়তো। চায়ে চুমুক দিয়ে , মোবাইলে একটা ফোন করে প্রণয়।
“গুড মর্নিং প্রণয় স্যার। হাউ আর ইউ ? হোয়াটস আপ ?”
ফোনের অপরপ্রান্তে শ্রী। শচীন আর শ্রীনিবাসন। সাউদার্ন জোনের মার্কেটিং হেড। প্রণয়ের সমপদস্থ। কথা শুনে, প্রণয় বলে, “গুড মর্নিং শ্রী। আয়াম ফাইন। হাউ আর ইউ ডুইং”? তারপর, একটু বিরতি নিয়ে বলে। “শ্রী, আই হ্যাভ গট আ প্রবলেম”।
“প্রবলেম ! হোয়াটস দ্যাট” ?
“শ্রী।ক্যান ইউ রিকল আউয়ার, লাস্ট মিটিং ইন হায়দরাবাদ ? টপ অফিসিয়াল ফ্রম অল ফোর জোন্স ওয়ের দেয়ার”।
“ইয়েস। আই ক্যান”।
“আই গেভ ওয়ান প্রেজেন্টেশন। ক্যান ইউ রিকল”?
“ইয়েস ইয়েস ।আই ডু”।
“দেন ইউ মাইট বি রিমেম্বারিঙ দ্যাট, আই গেভ আ কপি অফ মাই ফাইল টু ইউ। আই বিলিভ ইউ সেভড দোজ ম্যাটারস ইন ইউর ল্যপি”।
“ইয়েস দোজ ম্যাটারস আর স্টিল উইথ মি”।
যেন আকাশের চাঁদ পেলে প্রণয়।একটা আশার জানালা খুলে গেল। আর ভয় নেই। লাস্ট পনের দিন আগের ডেটা আছে ওতে।যা আছে, তা দিয়েই এটা বানানো সম্ভব। ম্যানেজ হয়ে যাবে।সেদিনের প্রেজেন্টেশনটা এমেন্ড করেই প্রণয় আজকেরটা বানিয়ে ফেলবে। প্রণয় তৎক্ষণাৎ বলে,
“শ্রী, প্লিজ মেইল ইট টু মি”।
“ডোন্ট ওরি। জাস্ট ওয়েট ফর আ ক্লিক। আয়াম সেন্ডিং ইট রাইট নাও। ওকে। থ্যাংক ইউ। টেক কেয়ার”।
“থ্যাংক ইউ ডিয়ার। হ্যাভ এ গ্রেট ডে”।
ইমেলটা ওপেন করে প্রণয়। দ্যাখে, ইনবক্সে নিউ মেইল।মাঝে আর কোনও ফোন নয়।একমনে পিপিটি বানায় । একটু স্থির হয়ে বসে। নিজেকে তৈরি করে নেয় । প্রেজেন্টেশনের জন্য। আর মাত্র দশ মিনিট। শুরু হবে মিটিং। নিজেকে একটু স্থির করার সময় নিল প্রণয়।তারপর সোজা এগিয়ে যায় লম্বা করিডর দিয়ে । সামনেই বোর্ড রুম।কোম্পানির টপ মানেজমেণ্ট এবং ভালুড ক্লায়েন্ট এখনি এসে পড়বে।
#
বাড়ি ফিরে দেখে ঝিল্লি বেশ ব্যস্ত।অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে সোফায় হেলান দিয়ে রিমোটে চাপ দেয় প্রণয়। গ্লোবাল ইকোনমিক ক্রাইসিসে একটু বেশিই চিন্তা হচ্ছে। বড় বড় কোম্পানী গুটিয়ে নিচ্ছে ব্যবসা। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক, এয়ার লাইন্স, বিগ কর্পোরেট হাউস সব ক্রাইসিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। পিঙ্ক স্লিপ পাচ্ছে অনেক এমপ্লইজ। এ এক নতুন ভয় এসে পড়েছে। আজকের প্রেজেন্টেশনটাও ক্লায়েণ্টের সামনে খুব যে ভাল হল তা নয়। একটা চাপা আসন্তোষ মনের ভেতরে কাজ করে। ক্লায়েন্ট যদি কনভিন্সড না হয়, কী জবাব দেবে হায়ার অথরিটিকে। একটা মসৃণ জীবন প্রবাহ হঠাত্ করে ধাক্কা খেতে খেতে অস্থির করে দিচ্ছে দৈনন্দিন। স্টুডেন্ট হিসেবে প্রণয় বরাবরের ভালো। যাদবপুর থেকে বি ফার্ম। বাঙ্গালোর থেকে এম ফার্ম। পুণের নামি প্রাতিষ্ঠান থেকে এমবিএ। ভালো সিটিসি প্যাকেজ পায় এখানে। কোম্পানিতে ওর পারফর্মম্যান্স খুব ভালো। দারুণ বিজনেস প্রমোট করেছে বিগত বছরগুলিতে। গত পাঁচ বছরে দুটো প্রোমোশন।উত্তরণটা যথেষ্ট আকর্ষণীয়।
ভেতরের ঘর থেকে ঝিল্লির গলা শোনা যায়।
“একবার এসো। তাড়াতাড়ি”।
দেখে, ঝিল্লি রেডি হচ্ছে। ঝিল্লিই একমাত্র নির্ভরতা। প্রণয়ের প্রতিষ্ঠা।যশ। প্রতিপত্তি। উত্তরণ। সবসময় সব ব্যাপারে সাপোর্ট করে। এটাই প্রণয়ের অহংকারের জায়গা। এই একটা সম্পদ নিয়ে প্রণয় কাটিয়ে দেবে সারা জীবন।ঝিল্লি বর্ধমানের মেয়ে। যাদবপুরে একসাথে এক ট্রেড নিয়ে পড়াশুনো। জীবনের দাবি মেয়ে ঘটনার পারম্পর্যে ওরা আজ সংসার করছে।ঝিল্লি কেন ডাকছে, প্রণয় জানে। এই চার বছরের বিবাহিত জীবনে ও, ঝিল্লির আহ্বান বুঝতে পারে। কোথাও যাওয়ার সাজগোজের সময় শাড়ির কুঁচি ধরে দিতেই হয় প্রণয়কে। একটু সময় যায়। ঝিল্লি আবার ডাকে।টিভির সাউন্ড মিউট করে প্রণয় আসে। বলে, “বলো।তাড়াতাড়ি করে ডাকলে “? “কখন থেকে ডাকছি তোমাকে” ?·
প্রণয় এতক্ষন ধরে যা কিছু ভাবছিল তার বিন্দুবিসর্গও জানতে দেয় না ঝিল্লিকে। আজকের বোর্ড মিটিঙের আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা, যুদ্ধ করে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বানানো, হায়ার অথরিটির অসন্তুষ্টি, বাইরের দুনিয়ার ইকোনমিক মেল্টডাউনে নিজের অন্তরে নেমে যাওয়া ধ্বস , এ সব কিছুকে মাইল মাইল দূরে সরায় প্রণয়। ঝিল্লির জন্য ভালবাসাটুকুই সে রাখতে চায়।
একটা বিয়ে বাড়িতে যেতে হবে আজ। ঝিল্লি রেডি হচ্ছে। প্রণয় বলে, “এই তো এসে গেছি। বলো। নীলা।”
বলেই হাসে।
“নীলা ? কে নীলা “?
“যে নীল রঙে সেজে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে”।
“মানে “?
“ভেরি সিম্পল। আমি তো দেখছি, আমার সামনে নীল শাড়ি ! নীল দুল। নীল হার।আর মনের ভেতরটাও আকাশের মতো নীল।উদার।”
দুজনেই বেশ জোরে হাসে।
ঝিল্লি বলে, “তুমি নিয়ে এসেছ ওটা ? দাও। আমি সাজাব। ফটোগুলো সিলেক্ট করেই রেখেছি”।
অনলাইনে পছন্দ করে ঝিল্লি অর্ডার করেছিল। প্রণয় নিয়ে এসেছে। রেখেছেও ঝিল্লির ড্রেসিং টেবিলেই। সুন্দর একটা ফটোফ্রেম। ঝিল্লি দেখে খুশি হয় খুব। বলে, “বাহ। সত্যিই সুন্দর। ফটোতে ভালো লাগছিল। কিন্তু তার চেয়ে এখন আরও ভালো লাগছে”।
যত্ন করে ধরে ঝিল্লি। তারপর বেছে রাখা ফটোগুলো এক এক করে রাখে। একসাথে পাঁচটা ফটো রাখা যায়। ফটোগুলো সাজানো হলে সত্যিই অপূর্ব লগে ফ্রেমটা । ফটোফ্রেম আসলে তো স্মৃতিকেই ধরে রাখে। একটা মায়া জড়িয়ে থাকে। প্রণয় আপ্লূত। ঝিল্লি স্মৃতিকে ভালোবেসে বেঁধে রাখতে চায়।
ওটা যত্ন করে নামিয়ে রাখে। দেওয়ালে ঝোলবে এরপর। ঝিল্লি বলে, “আজ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।তোমাকে বলিনি। তোমার মিটিং ছিল। আর নিজেই সমলেও নিয়েছি”।
“কেন, কী হয়েছে “? প্রণয় শোনার আগ্রহ দেখায়।
“তুমি অফিস যাওয়ার পর ওয়াশিং মেশিন চালিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ চলার পর একটা অদ্ভুত আওয়াজ। এরকম কখনও হয়নি। ভয়ে বন্ধ করে, টোল ফ্রিতে ফোন করি।দুপুরে লোক এসেছিল। সারিয়েও দিয়েছে”।
প্রণয় অবাক হয়। কলেজ লাইফের সেই আপাত বোকা মেয়েটা কী সাংঘাতিক সংসারি হয়ে গেছে। সংসার প্রতিষ্ঠানটাই এরকম। বিশ্বের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখা।নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতে এগিয়ে যাওয়া। প্রণয় একটু হাসে। বলে, “এত বড় কাণ্ড! কী হয়েছিল” ?
এবার জোর হসে ঝিল্লি। ওর এই হাসিটা খুব ভালোবাসে প্রণয়।ছোট্ট ঢিল, পুকুরে মারলে একটা ছোটো তরঙ্গ তৈরি হয়ে আস্তে আস্তে কিনারায় পৌছয়।ঝিল্লির সারা মুখ জুড়ে এমনই হাসির বিস্তার দেখল প্রণয়। ঝিল্লি বলে, “একটা পেন ড্রাইভ মেশিনের ভেতর আটকে গেছিল। আমি আবার ঠিকঠাক করে যত্ন করে রেখেছি । আমি ডেস্কটপে চালিয়ে দেখে নিয়েছি। ঠিক আছে। আমি নিশ্চিত, ওটা তোমার প্যান্টের ভেতরে ছিল।তুমি যা আত্মভোলা”!
অবাক হয় প্রণয়। উল্লসিতও। একটা আলাদা উল্লাস প্রণয়ের ভেতর।
“কী বলছো, ঝিল্লি ? পাওয়া গেছে পেন ড্রাইভটা “?
“হ্যাঁ। আমি রেখেও দিয়েছি ওটা”।
দুজনের সুস্থিরতায় ঘরের পরিবেশ সুন্দর হয়ে ওঠে। ওরা রেডি হয়। একটু পরেই বিয়ে বাড়িতে যেতে হবে।
সারাদিন যা গেছে তা আর নতুন করে এখন ভাবতে চায় না প্রণয়। হারানো কিছু উদ্ধার হলে তার মধ্যে অন্যরকম আনন্দ থাকে। সেই আনন্দটা এখন উপভোগ করার সময়। প্রণয় বলে, “দাও ওটা আগে রেখে দিই। আমার অফিস ব্যাগে”। ঝিল্লি যত্নে রাখা পেন ড্রাইভটা বের করে প্রণয়কে দেয়। আর বলে, “হারানো কিছু উদ্ধার করে দিলে উপহার দিতে হয়। জানো তো ? কী দেবে আমায়” ?
প্রণয়ের মুখে হাসি। তৃপ্তির। বলে, “নিশ্চয়ই দেবো। এবার সামারে সিমলা”।
0 comments:
Post a Comment