সম্পাদকের কলমে
লেখা পাঠানোর জন্য
Total Pageviews
বিধবা সেজে
বরুণ চন্দ্র পাল
জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে শৈশবেদেখা একটা অলৌকিক ঘটনার গল্প বলছি । তখন আমার বয়স কতো বারো কি তেরো ? মাটির কোঠাঘরে আমি একলা থাকি । জায়গাসংকুলান তো বটে তারচেয়ে অধিক উদ্দেশ্য নির্জনপাঠ । প্রাকৃতিকবেগ তাড়া দেবেনা তাতো হয়না ? ঘরসংলগ্ন বাথরুম চল্ ছিলোনা তখনো । এটা গ্ৰামীণসংস্কার না অভাব তাও জানিনা ।কষ্ট হতো রাতে । ছোটটাও সারতে যেতেহতো খুঁজেনিয়ে
বাইরের ফাঁকাজায়গা !
আমাদের ঘরটা আবার ভেতরদিক । সরুগলি বেয়ে আটদশটা বাড়ির পর ।খাড়া দেওয়ালগুলো ছায়াদেয় সত্যি রাত্তিরে অন্ধকারটা হয়েওঠে ঘুঁটঘুঁটে আরো ও ঘোরালো । একাল সেকাল বলো আজগুবি
গল্পকথা শোনায় ঠাম্মামাত্র-ই । ব্যতিক্রম আমার-ও
হয়নি ? বরং ঠাম্মার কোলে মাথা রেখে ভয়মিশ্রিত কাহিনিগুলি শুনতে না-পেলে বা কাজের অজুহাতে
তিনি অরাজি হলে আমি জুড়ে দিতাম কান্না ? এমন কতোরাত্তির ঘুমোতে পারিনি ....ক্লান্তিও লাগেনি আনন্দে ? লাভ একটা গল্পগুলো আজো থেকে গেছে মস্তিষ্কগভীরে ...থ্যাঙ্ক ইউ ঠাম্মা !
বেণুকাকিমার গলায়ফাঁসে আত্মহনন ; খড়েরগাদায়
লুকোচুরি খেলতে গিয়ে কাঁচাবয়সী সোনামণির আগুনে পুড়ে তার ঝলসানো দেহের বীভৎসতা ...ইন্দুপিসিকে কোন্ যৌবনরাক্ষস ঘাড়মটকে রক্তচুষে খাওয়ার উদ্ভট ও লোমহর্ষক ইতিবৃত্তগুলি কিছুতেই আমি হাতছাড়া করতে পারিনি ?
আসলটাই আসি । পেটেপাথর না বাচ্চা আসায় গোপনে হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে দেখাতে গিয়ে মারা গেলো রাঙাব-উদি । কমবয়সে মরলে আত্মা নাকি স্বর্গে পৌঁছোয়না ...ঘুপটিমেরে বসেথাকে আশপাশ ।
সবাই বলাবলি করে : সরুগলিটার ফাঁকা জানালায় পা দুলিয়ে হিহি করে হাসে ! ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল...
গ্ৰামের মানুষগুলো যেন কেমন বলেই খালাস ? উপায় বলেনা । কেউ বুকে থুতু ছিটোয় .. চুপিচুপি রামনাম জপে ..কেউবা চোখ বুঁজে দে দৌড়্ ...
একদিন জোর তলপেটে চাপ টের পাচ্ছি । নেমে কাকে ডাকবো ? খেটেখুটে মা ঘুমে কাদা । বাপ্-টাও
ভোঁস্ ভোঁস্ করে নাক ডাকছে ...সেটা অবশ্যই ছিলো জোছনা রাত । ম্যাঁয় পুরুষ হুঁ ...ভূত আবার কি ? দাদু বলতেন : ' না-দেখে আঁতাতে নেই ? '
- ' আঁচানো কি দাদু ? '
-' আঁচে পুড়ে যাওয়া যেমন । আগুনে পুড়লেই তার বেরিয়ে আসেরে দাদুভাই ? '
-' কী ব-ইলছো গো ? '
-' বিশ্বাস হচ্ছে সবমিলিয়ে সত্যকে চেনা ! ' নাজানি জিদ আমার বেড়েগেলো আরও...
ভয় সরেনি তখনো ।পা টিপেটিপে এগোচ্ছি । ইতিউতি ছেড়ে দৃষ্টি এখন অর্জুনের শরক্ষেপের মতো উল্লিখিত স্থানটায় ... পেরিয়ে কাজ সারার প্রাকমুহুর্তে অদূরে চোখ রাখতেই অবাক ! বিধবা সেজে কে যেন বসে আছে । গা ছমছম ...
কাঁপছি আমি ঘেমে নেয়ে ভিজে গেছি ।চেঁচাতেও
পারছিনা.. আলগা হয়েগেছে প্যান্টের দড়িটা ;
জাপটে ধরা হাতের মুঠোয় ....শিউরে উঠছি ! দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার মতো ।
তাহলেও দাদুর কথামতো কাছে গিয়ে দেখলাম :ভগ্নবৃক্ষের কোটরে বেশকিছুটা দূরে
অবস্থিত নিমগাছটার ডালফাঁক ঠিকরে জ্যোৎস্নার আলো এমন সৌন্দর্য্য-ভয়াল রুপমূর্তি সৃষ্টি করেছে ।
শিশু চরিত্র নয় ..দুর্বলচিত্ত যেকেউ মূর্চ্ছা যেতে পারে
অনায়াসেই ? আমিও কি তেমন ?
ফিরে এসে আমার কি হয়েছিলো মনে নেই । চোখ খুলতেই দেখি : কোঠাঘর নয় একলাও ; জটলায় শুয়ে আছি ঠাম্মার কোলে । পিসিমা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন :' সাহসটা বলিহারি তোর্ রে বীরে ... ভাগ্যিস্ গন্ডিকেটে পালিয়ে আসতে পেরেছিলি ? খপ্-করে ধরে যদি ঘাড় মটকে "...
হোহো করে হাসছেন দাদুমশাই । ঠারে ঠারে বোঝাতে লাগলেন : ' শিক্ষাগুরু বিনিপয়সায় শেখালেও শিক্ষার্থীর শিখন কিন্তু আত্মবিশ্বাসের চেয়েও বেশি ? '
অলৌকিক শব্দটার বোধগম্যতায় সবাই এবার মাথা নাড়লো এবং আমাকে জড়িয়ে আদর করতে লাগলো ...
0 comments:
Post a Comment